চাঁদরাইডের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে সম্প্রতি রাজধানীর মৌচাকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা(সিইও) মো. নাঈম হোসেনের সঙ্গে। কথায় কথায় তিনি জানালেন চার বন্ধুর নতুন এ উদ্যোগের পথচলার কথা। 

ঢাকায় বেড়ে ওঠা নাঈম ২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বিভিন্ন কারণে পড়াশোনাটা ঠিকঠাক চলছিল না তাঁর। তাই দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়তে লন্ডনে পাড়ি জমান নাঈম হোসেন। সেখান থেকে দেশে ফেরেন ২০১০ সালে। তবে যুক্তরাজ্যে থাকা অবস্থাতেই ব্যবসায় হাতেখড়ি ঘটে তাঁর।

নাঈম হোসেন জানান, লন্ডনে পড়াশোনার খরচ নিজেকেই চালাতে হতো। সপ্তাহে মাত্র ২০ ঘণ্টা কাজের অনুমতি ছিল। এতে খুবই কম আয় হতো বলে দেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে সেখানে বিক্রি করতেন নাঈম ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু।  

নাঈম বলেন, ‘আমরা দেশ থেকে ধুন্দলের ছোবড়ার মাজুনি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক নিয়ে পথের ধারের দোকানে বিক্রি করতাম। পাশাপাশি চীন থেকে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য এনে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রি করতাম। এসবের আয় দিয়ে ভালোভাবেই চলে যেত আমাদের।’ 

স্নাতক শেষে দেশে ফিরে প্রথমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন নাঈম। এরপর একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে ২০১৪ সালে বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান খোলেন তিনি। সেই সুবাদে কৃষি খাতের চীনা বহুজাতিক কোম্পানি জাদেশান এ্যাগ্রি সায়েন্সের সঙ্গে কাজের সুযোগ হয় তাঁর। 

২০১৮ সালে চীনা কোম্পানিটির হয়ে কাজ শুরুর পরে নাঈম প্রথমেই পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যায় পড়েন। নাঈম বলেন, ‘আমার নিজের গাড়ি ছিল না। মাঠপর্যায়ের কর্মীদেরও মোটরসাইকেল না থাকায় দূরবর্তী এলাকায় যেতে অসুবিধা হতো। সে সময় কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনতে পারিনি। মোটরসাইকেল ভাড়া দেয় এমন কোনো প্রতিষ্ঠানও দেশে ছিল না। তখনই চিন্তা করি, সুযোগ পেলে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব।’

সেই চিন্তা থেকে ২০২০ সালের শুরুতে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন নাঈম হোসেন। তাঁদের মধ্যে বোরহানউদ্দীন চৌধুরী, মাকসুদুর রহমান, সৌমিত্র বড়ুয়া–এই তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই বছরের মাঝামাঝি অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন। উদ্যোগের নাম দেন চাঁদরাইড। তবে অ্যাপভিত্তিক আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় গত মে মাস থেকে। নাঈম বলেন, গাড়ি চালানোর অনুমতি (ড্রাইভিং লাইসেন্স) থাকলে যে কেউ আমাদের থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া নিতে পারবেন। ঘণ্টা হিসেবে যেমন মোটরসাইকেল ভাড়া নেওয়া যাবে, তেমনি দিন, সপ্তাহ ও মাস ভিত্তিতেও মোটরসাইকেল ভাড়া নিতে পারবেন গ্রাহকেরা। প্রতি ঘণ্টার জন্য গ্রাহককে ভাড়া গুনতে হবে ৫৮ টাকা করে। আর মোটরসাইকেলভেদে দৈনিক ৪২৬-৪৪৩ টাকা, সপ্তাহে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা এবং মাসে ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৭০০ টাকা ভাড়া লাগবে। ভাড়া নিয়ে যেতে পারবেন ঢাকার বাইরেও। 

এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ গ্রাহক চাঁদরাইড থেকে সেবা নিয়েছেন। বর্তমানে চাঁদরাইডের ৩০টি মোটরসাইকেল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশই মাসজুড়ে ভাড়ায় থাকে বলে জানান নাঈম হোসেন। তিনি জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবী মানুষেরা মাসিক ভিত্তিতে মোটরসাইকেল ভাড়া নেন চাঁদরাইড থেকে। আর করপোরেট কোম্পানিগুলো বছর চুক্তিতে মোটরসাইকেল ভাড়া নিতে পারে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো মেয়াদে গ্রাহকেরা ভাড়া নিতে পারবেন। মোটরসাইকেল ভাড়া নিলে গ্রাহককে বিমা সুবিধা, মবিল ও সার্ভিসিং খরচ এবং নিরাপত্তাসামগ্রীও দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

চার তরুণের এই উদ্যোগে প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১১ লাখ টাকা। শুরুতে মাত্র তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। এখন তাঁদের কাছে ভাড়া দেওয়ার মতো মোটরসাইকেল আছে ৩০টি। এর মধ্যে নারীদের জন্য আলাদাভাবে আছে ৫টি স্কুটি। আগামী বছরের মধ্যে আরও ২০০টি মোটরসাইকেল ও ২০টি গাড়ি যুক্ত করতে চায় চাঁদরাইড। আর বর্তমানে ঢাকার মধ্যে থাকা কার্যক্রমকে সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।  

তবে প্রতিষ্ঠানটিকে এ পর্যায়ে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। নাঈম হোসেন জানান, শুরুতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিনিয়োগ ছিল খুবই কম, কিস্তিতে কোনো কোম্পানি বাইক বিক্রি করতে চায়নি। গ্রাহকের আস্থা অর্জনেও বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে করোনার কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করতে দীর্ঘ সময় লেগে গেছে। তবে সব বাধা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান চাঁদরাইডের উদ্যোক্তারা। 

কেউ যাতে মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে পালাতে না পারেন, সে জন্য গ্রাহকের বিপরীতে একজনকে গ্যারান্টার বা জামানতকারী হিসেবে রাখা হয়। ওই জামানতকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর তা সংরক্ষণ করা হয়। তারপরই ভাড়া দেওয়া হয় মোটরসাইকেল। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা জানান, মূলত মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষই তাঁদের প্রধান গ্রাহক। যাঁদের অনেকের মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য নেই, তাঁরা সহজেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাড়ার বিনিময়ে যাতায়াতকে দ্রুত ও সহজ করতে এ সেবা নেন।