গভর্নর সূচনা বক্তব্য দেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এরপর পুরো অনুষ্ঠান ছিল প্রশ্নোত্তরভিত্তিক।

গভর্নর বলেন, একটি সমীক্ষা হয়েছিল। এতে দেখা যায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় দেশের অর্থের সরবরাহ ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ। অথচ ভারতে তা ৮৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১২০ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরে ১৫০ শতাংশ। গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি বড় সমস্যা হলেও আমাদের পদক্ষেপের কারণে ইতিবাচক ধারা আসতে শুরু করেছে। প্রবাসী আয় ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে, আমদানিও কমেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় ঋণের সুদ ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদ ৬ শতাংশ তুলে দেওয়ার চিন্তা আছে কি না, জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ৬ শতাংশের ব্যাপারে কিছু বলা নেই, আছে ৯ শতাংশের ব্যাপারে। গভর্নরের প্রশ্ন—‘তুলে দিলে কী হবে? এতে ঋণের সুদহার অনেক বেড়ে যাবে। যার প্রভাবে কমে যাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ। বিনিয়োগও কমে যাবে এবং সবশেষে কর্মসংস্থান কমে যাবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থাও ব্যাহত হবে তখন।’

একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থাকা বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘কে, কোন ব্যাংকের মালিক তা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা চাই সুশাসন। বিদেশি ব্যাংকগুলো আমাদের দেশের কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণপত্র (এলসি) নেয় না, আরেক ব্যাংকের নিশ্চয়তা চায়—এমনটা আমরা আর চাই না।’

গভর্নরের বক্তব্যের মূল কথাগুলো সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামকে জানালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির একটু উন্নতি হবে এবং এতে মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে। ইউক্রেন থেকে গম আসার পথ তৈরি হয়েছে। তবে রপ্তানি আয় কীভাবে বাড়বে আমার বোধগম্য নয়। আমাদের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যস্থলের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই আমাদের পণ্যগুলোর চাহিদা তাদের কাছে কম থাকবে। তবে নতুন লোক বিদেশে যাওয়ায় প্রবাসী আয় ভালো আসতে পারে, যদিও বছরের সব সময়ই তা কমে বাড়ে।’

জিডিপির তুলনায় অর্থের সরবরাহ কম থাকাটা গভর্নর ঠিকই বলেছেন বলে মনে করেন মির্জ্জা আজিজ। তিনি অবশ্য বলেন, সুশাসন আনতে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা জানা গেল না। ব্যাংকঋণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যাংক মালিক ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে যে আঁতাতের সম্পর্ক থাকে, তা দূর করতে না পারলে ব্যাংক খাতে সুশাসন আশা করা দুরূহ।

ডলারের দাম স্থিতিশীল হওয়ার আশা

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোই তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়, ২০২১ সালের জুনে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ছিল ৮৪ দশমিক ৮১ টাকা, এ বছরের আগস্টে তা হয়েছে ৯৪ দশমিক ৭০ টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতার স্বার্থে ২০২১ সালে ৭৭০ কোটি ডলার কেনা হলেও ২০২২ সালে বিক্রি করা হয় ৭৪০ কোটি ডলার। জুলাই মাসেই বিক্রি করা হয় ১১৯ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা টাকার অবমূল্যায়ন করছি না বলে সমালোচনা ছিল। এখন অনেকটাই করেছি।’

ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জের অনিয়ম চিহ্নিত করতে ১০টি পরিদর্শক দলের কাজ করা, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের সুদ ২ থেকে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা, প্রবাসী আয় দেশে আনার পদ্ধতি সহজ করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ডলারের তুলনায় টাকার বিনিময় হার ৯৪ দশমিক ৭ টাকা যে বলা হচ্ছে, কিছু ব্যাংক তো বাজার থেকে ১১২ টাকা দরেও ডলার কিনেছে। সেই ডলার দিয়ে পণ্য আমদানি করায় পণ্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে, যার চাপ পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে। অনেকেই এটা বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘বোধ হয় আস্তে আস্তে সেদিকে যাব। আর আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ডলারের দাম স্থিতিশীল পর্যায়ে আসবে।’

সুশাসন চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ব্যাংক খাতে সুশাসন চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার অংশ হিসেবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করতে ৪টি চলকের ওপর ভিত্তি করে এ দফায় ১০টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা হয়েছে। চলকগুলো হচ্ছে—শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা, মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনের পরিমাণ।

বলা হয়, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদা আলাদা (ওয়ান টু ওয়ান) ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তিন বছর মেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এর পর প্রতিটি ব্যাংকের অগ্রগতি বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণ করবেন।

দুর্বল ১০টি ব্যাংকের নাম উল্লেখ করবেন কি না, জানতে চাইলে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, নাম না বলাই ভালো।

একশ্রেণির আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে মানুষ টাকা ফেরত পাচ্ছেন না, একশ্রেণির দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি দাঁড়ায় কি না, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনাস্থার বিষয়টি সবার জানা। এ অনাস্থা যাতে ব্যাংক খাতে না আসে সে জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। আগে ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা আনতে কাজ করছি। এরপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হাত দিতে চাই।’

স্বল্প মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে ব্যাংক খাতকে বেরিয়ে আসতে হবে বলেও মনে করেন গভর্নর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এসব বক্তব্য নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সমস্যাগুলো যে অনুধাবন করতে পেরেছেন, এ জন্য গভর্নরকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তবে পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয়। যেমন আমানত ও ঋণের সুদের পার্থক্য বেশি থাকে না। ব্যাংকগুলো আমানতে ৮ থেকে ৯ শতাংশের বেশি কখনো দেয়নি। ফলে সুদের হার উন্মুক্ত করে দেখা যেতে পারে।

ব্যাংক খাতের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ খুব দুর্বল হয়ে গেছে— উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মালিকদের সংগঠন বিএবি সেভাবে কথা বলে, এমডিদের সংগঠন এবিবি একই ভাষায় কথা বলে। এবিবির সবল হওয়া দরকার। তিনি বলেন, ১০টি ব্যাংককে বিশেষভাবে নজরে রাখলেও সুশাসন দরকার পুরো ব্যাংক খাতেই। তবে সদিচ্ছা থাকলে অনেকখানিই সম্ভব।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন