আবদুর রবসহ ৩০ জনের মতো মানুষ যেখানে সকালে অপেক্ষায় ছিলেন, সেখানে বেলা ১১টা নাগাদ মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় শতাধিক। যদিও একটা সময় তাঁরা ফিরে যান চালের ট্রাকের দেখা না পেয়ে।

এই চাল বিক্রি করে খাদ্য অধিদপ্তর, খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচির আওতায়। প্রতি কেজির দাম ৩০ টাকা। সঙ্গে থাকে আটা—প্রতি কেজি ১৮ টাকা। একেকজন ক্রেতা পাঁচ কেজি চাল ও চার কেজি আটা কিনতে পারেন। এতে ব্যয় হয় ২২২ টাকা। বাজার থেকে কিনলে একই পরিমাণ চাল ও আটার দাম পড়ে ৫০০ টাকার কিছু বেশি।

খাদ্য অধিদপ্তর প্রতিবছরই এই চাল ও আটা বিক্রি করে। করোনাকালের আগে খাদ্য অধিদপ্তরের ট্রাকের পেছনে কোনো ভিড় দেখা যেত না। এমনকি ২০২০ ও ২১ সালেও মানুষের এতটা ভিড় দেখা যায়নি। কেন মাত্র পাঁচ কেজি চাল ও চার কেজি আটা কিনতে ভোরবেলা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন—তাঁর কারণ জানালেন কয়েকজন। কোলে ১০ মাসের শিশুসন্তান নিয়ে আসা তাসলিমা বেগম বললেন, তাঁর স্বামী ৯ হাজার টাকা বেতন পান। সেই টাকা দিয়ে আর সংসার কোনোভাবে চলছে না। শিশুসন্তানের মুখে ভালো খাবার দিতে পারেন না। যদি চাল কিছুটা কমে পাওয়া যায়, তাহলে কিছুটা সাশ্রয় হবে।

পরিবাগে চালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকে বেলা ১১টার দিকে বাসার পথে পা বাড়ানোর সময় তাসলিমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের দুই দিন সকাল সাতটায় এসেছিলাম। ট্রাক আসেনি। আজও এল না, চাল পেলাম না।’

দেশের বাজারে চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ায় মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে, তা বিভিন্ন গবেষণায় এসেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গত মাসে জানিয়েছে, ৬৮ শতাংশ খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) ৯ নভেম্বর এক সেমিনারে জানায়, অতিদরিদ্র মানুষের আয়ের ৩২ শতাংশ ব্যয় হয় চালের পেছনে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এক কেজি মোটা চালের সর্বনিম্ন দাম ছিল ৩০ টাকা, যা এখন ৪৬ টাকার মতো। যদিও গতকাল কাঁঠালবাগান ঢালে ওএমএসের চাল কেনার জন্য ২০ জনের মতো মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাজারে ঢুকে দেখা গেল, ৫৫ টাকা কেজির নিচে কোনো চাল নেই। বাজারটিতে প্রতি কেজি আটার দাম ৬৫ টাকা। এ বছরের শুরুতেও খোলা আটার কেজি ছিল ৩০ টাকার নিচে।

বাজারের সাদিয়া রাইস এজেন্সি নামের একটি দোকানের বিক্রেতা মো. মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে চাল ও আটার দাম একসঙ্গে বেড়েছে। আগে কখনো এমন হয়নি। এতে মানুষ কিনছে কম।’

বাজারটি থেকে ফিরে এসে জানা গেল, যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা চাল কিনতে পারেননি। কারণ, কাঁঠালবাগান ঢালে সেদিন চালের ট্রাক আসেনি।

দুপুরেই আটা শেষ

খাদ্য অধিদপ্তরের চাল অবশ্য বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়েছে। রাজধানীর পান্থপথ, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া এলাকায় ওএমএসের ট্রাক এবং দোকানের সামনে ছিল হুড়োহুড়ি ও ঠেলাঠেলি। সব জায়গায়ই চাল-আটা পেতে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। যেমন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন এলাকায় ৪০ জনের মতো লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকের হাতে লেখা ছিল সিরিয়াল নম্বর, যা নিজেরাই লিখে রেখেছিলেন। সকাল সাড়ে নয়টায় চালের ট্রাক আসে। সবাই হুড়োহুড়ি শুরু করেন। আগে যে লাইন ছিল, তা ভেঙে যায়।

শেওড়াপাড়ার ওএমএসের ট্রাকের কাছে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে দেখা যায়, বেলা একটা পর্যন্ত প্রায় আড়াই শ মানুষ পাঁচ কেজি চাল ও দুই প্যাকেট (৪ কেজি) আটা নিতে পেরেছেন।

এরপর আটা শেষ হয়ে যায়। শুধু চাল বিক্রি করেন বিতরণকারী কর্মীরা। অনেকে না খেয়েও বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিকেল পাঁচটায় ট্রাকে করে আনা সব পণ্য শেষ হয়ে যায়। চাল না কিনতে পেরে ফেরত যেতে হয় তিনজনকে। যাঁরা চাল পেয়েছেন, তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়েছে অন্তত তিন ঘণ্টা।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিবেশকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের একেকজনকে প্রতিদিন দুই হাজার কেজি চাল ও এক হাজার কেজি আটা দেওয়া হয়। নির্ধারণ করে দেওয়া জায়গায় তা বিতরণ করা হয়। কোন জায়গায় কোন দিন বিক্রি হবে, তা নির্দিষ্ট নেই। খাদ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগরে ২০০টি স্থানে ট্রাক ও দোকানের মাধ্যমে চাল-আটা বিক্রি হয়।

শেওড়াপাড়ায় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে যে তিনজন চাল কিনতে পারেননি, তাঁদের একজন মো. আবু সাঈদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি অসুস্থ। তাই বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। এ জন্য দুপুরের পরে এসে দাঁড়ান। কিন্তু চাল আর পাননি।

শুধু ট্রাকে নয়, পরিবেশকের মাধ্যমে দোকানেও বিক্রি হয় ওএমএসের চাল। রাজধানীর কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া দুই পরিবেশকের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, দুটি দোকানেই শতাধিক মানুষের ভিড়।

ওএমএসের ট্রাক ও পরিবেশকের দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মধ্যে দরিদ্রদের সঙ্গে নিম্নবিত্তরা ছিলেন। ছিলেন মোটামুটি সচ্ছল মানুষও, যাঁরা এখন বিপাকে রয়েছেন।

কাঁঠালবাগানের আসমা মুস্তাফিজ নামের এক নারী জানালেন, তিনি ১৫ বছর ধরে ডায়াবেটিসের রোগী। তাই রুটি খেতে হয়। তিনি বলেন, ‘এখন এক কেজি আটার দাম আগের দুই কেজির সমান। তাই দুই বেলার পরিবর্তে এখন এক বেলা রুটি খাই।’

অন্যদিকে শেওড়াপাড়ায় চা ও পানের টংদোকান দিয়ে সংসার চালানো জেয়াসমিন বেগম বলেন, ‘বাসায় এক ফোঁটা চাউল নাই। দোকান ফেলে এখানে এসেছি। চাল নিতে পারলে দুপুরে রান্না হবে।’