মূল্যস্ফীতি কমাতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আবারও কঠোর বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদহার বাড়িয়েছিলেন। নতুন গভর্নরও সেটি বহাল রাখলেন। তবে নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রাক্কলন আগের চেয়ে কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থবছরের প্রথমার্ধের, অর্থাৎ আগামী জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। সেখানে নীতি সুদহার, ঋণের প্রবাহ, জিডিপির লক্ষ্যমাত্রাসহ ব্যাংক খাতের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়। রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে মুদ্রানীতি প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান, নূরুন নাহারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক খাত, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এসএলএফের নীতি সুদহার সাড়ে ১১ শতাংশ এবং এসডিএফের হার সাড়ে ৭ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এই দুই ধরনের সুদহার আন্তব্যাংক ধার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা অনেক কমে গেছে। তাই আগের মুদ্রানীতির বেসরকারি খাতের সাড়ে ৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এ কারণে আগামী ছয় মাসের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে শেষ পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ১ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা জানতে চান কঠোর মুদ্রানীতির বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কীভাবে বাড়বে? জবাবে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এখান থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ নিতে পারবে।
খেলাপি কমাতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। যার আওতায় ব্যবসা পরিচালনায় সক্ষম কিন্তু আর্থিক সংকটে রয়েছে, এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন, যার মাধ্যমে অর্থঋণ আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি করা হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।
গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহার ব্যবধান ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ব্যাংক খাতে একধরনের সমস্যা ছিল। তারপর আরেক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। কিছু ব্যাংকের কাছে অনেক বেশি তারল্য। কেউ কেউ তার সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। এ জন্য এই সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি ঋণ নেওয়া সহজ হবে
সংবাদ সম্মেলনে মেঘনা গ্রুপের বিদেশি ঋণ নেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ‘আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল ছিল। এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই কোনো উদ্যোক্তা যদি ৫ বা ৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ আনতে পারেন, আমাদের নীতি হচ্ছে তাদের উৎসাহিত করা। আমরা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে চাই। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার অনুমতির বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।’
এ ছাড়া সিটি গ্রুপের বিষয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, সিটি গ্রুপের সমস্যাটি শুধু বিনিময় হারের কারণে হয়নি। সিটি গ্রুপের সঙ্গে ২৯টি ব্যাংক জড়িত। তাদের মধ্যে তিনটি শীর্ষ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সিটি গ্রুপের সমস্যা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা একসঙ্গে বসে কিছু সমাধান তৈরি করেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়িত হলে সিটি গ্রুপ এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান সাংবাদিকেরা। জবাবে গভর্নর বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনুমাননির্ভর কথাবার্তা অনেক বেশি হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে কথা কম বললে ভালো। আমাদের একটু সময় দেন।’