মূল্যস্ফীতি কমাতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) আগের মতোই ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজ মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থবছরের প্রথমার্ধের, অর্থাৎ আগামী জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে মুদ্রানীতি প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান, নুরুন নাহারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে বর্তমানে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার (রেপো) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এ ছাড়া আন্তব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে এ সুদহার প্রযোজ্য হয়।
অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ডেপুটি গভর্নর জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই নীতিগত অবস্থানের ফলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইতিবাচক উদ্দীপনা দেখা যাবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতিও ক্রমান্বয়ে কমে আসবে।
মুদ্রানীতি ঘোষণায় বলা হয়েছে, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতি করেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি গতকাল জারি করা হয়েছে। নতুন এ নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে থাকা, তবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে—এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আমরা কিন্তু এখন আর পুনঃ তফসিলীকরণ একেবারেই উৎসাহিত করছি না।’
গভর্নর আরও জানান, আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। সরকারের কাছে প্রস্তাব, যেন এই আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়।
বর্তমানে অর্থঋণ আদালত বা অন্যান্য আদালতে মামলাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চলে। সেই সুযোগ কমানোর জন্যই এই সুপারিশ বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। এই আইন পাস হলে ২০২৭ সালে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পাবে। নতুন আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ক্ষতিকর সম্পদ নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নিজেদের আর্থিক বিবরণীতে রাখা যাবে না, বরং তা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হবে।
ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
গভর্নর আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্টকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, যেকোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তি সর্বোচ্চ হবে। আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিই দেওয়া হবে।’