গৃহসজ্জার নান্দনিকতায় পিন্টারেস্টের প্রভাব কেন বাড়ছে
একসময় ঘর সাজানোর ধারণা পেতে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, দেশি–বিদেশি বিভিন্ন ম্যাগাজিন কিংবা দোকানের ক্যাটালগের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন এক মুঠোফোনেই হাজারো ধারণা মিলছে। বিশেষ করে পিন্টারেস্টে ঘর সাজানোর বিভিন্ন ছবি দেখে অনেকেই নিজের ঘর নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।
পিন্টারেস্ট মূলত ছবি ও নকশা খোঁজার এবং সংরক্ষণের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এখানে ঘর সাজানো, পোশাক, খাবার, ভ্রমণসহ নানা বিষয়ের অসংখ্য ছবি ও ধারণা পাওয়া যায়। কোন রঙের দেয়াল, কেমন আসবাব, কোথায় আলো থাকবে কিংবা ছোট জায়গাকে কীভাবে একটু বড় দেখানো যায়—সবকিছুর অনুপ্রেরণাই এখান থেকে মিলছে।
বদলে যাচ্ছে ঘর সাজানোর ভাবনা
পিন্টারেস্টে জনপ্রিয় ‘মুডবোর্ড’ বা নির্দিষ্ট নান্দনিকতার ধারণাও ঘরের সাজে প্রভাব ফেলছে। কারও পছন্দ সরল ও নিরিবিলি পরিবেশ, কেউ আবার উষ্ণ রং, কাঠের আসবাব ও নরম আলো দিয়ে ঘরে স্বাচ্ছন্দ্যের আবহ তৈরি করতে চান। আবার অনেকের পছন্দ কম আসবাব, খোলা জায়গা ও প্রাকৃতিক আলো। এসব ধারণা শুধু দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পছন্দের ছবিগুলো সংরক্ষণ করে অনেকে সে অনুযায়ী ঘরের রং, আসবাব ও সাজসজ্জার উপকরণ বেছে নিচ্ছেন। ফলে পিন্টারেস্ট ধীরে ধীরে ঘর সাজানোর পরিকল্পনা ও কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
পছন্দের কোনো ঘরের ছবি দেখার পর অনেকে সেই ছবির মতো আসবাব বা সাজসজ্জার উপকরণ খুঁজছেন বিভিন্ন আসবাবের দোকান, অনলাইন কেনাকাটার মাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে। কেউ ছবি দেখিয়ে স্থানীয় কারিগরকে কাছাকাছি নকশার আসবাব তৈরির কথা বলছেন, আবার কেউ বাজারে গিয়ে একই ধরনের পণ্য খুঁজছেন। দেয়ালের রং, আলো, পর্দা, কার্পেট কিংবা ছোট সাজসজ্জার উপকরণ কেনার ক্ষেত্রেও ছবিই হয়ে উঠছে পছন্দ নির্ধারণের একটি মাধ্যম। অর্থাৎ আগে যেখানে ঘর সাজানোর জন্য আলাদাভাবে নকশা বা পরামর্শের প্রয়োজন হতো, এখন অনেকেই অনলাইন থেকে ধারণা নিয়ে নিজেরাই সেই কাজ করার চেষ্টা করছেন।
নিজের ঘরের নকশায় নিজেই ভরসা
পুরো ঘরের নকশা ও সাজসজ্জার জন্য পেশাদার নকশাবিদ বা ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের সহায়তা নিলে নকশা, পরামর্শ ও বাস্তবায়নের জন্য আলাদা ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে পিন্টারেস্ট থেকে ধারণা নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে জিনিস কেনা এবং স্থানীয় কারিগর বা দোকান থেকে কাজ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকে নিজেরাই ঘর সাজানোর পথ বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে ছোট ফ্ল্যাট বা সীমিত বাজেটের ক্ষেত্রে কোন জিনিসটি প্রয়োজন, কোনটি বাদ দেওয়া যায় এবং কোন কাজটি পরে করা যাবে—এসব সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
ইনসাইড ইন্টেরিয়রের প্রতিষ্ঠাতা সুবর্ণা মোস্তারি বলেন, ‘পিন্টারেস্ট বা অনলাইন থেকে পাওয়া কোনো নকশা হুবহু নিজের ঘরে প্রয়োগ করলেই যে একই ফল পাওয়া যাবে, তা নয়। একটি ঘরের আয়তন, আলো–বাতাস, জানালার অবস্থান, আলো ও রঙের সমন্বয় পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবকিছুর সঙ্গে নকশার সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।’
ছোট জায়গায় বড় ভাবনা
ছোট ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে গৃহসজ্জার ব্যাপারটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একই জায়গায় বসা, কাজ করা, বিশ্রাম নেওয়া ও প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। তাই একাধিক কাজে ব্যবহার করা যায়, এমন আসবাব, দেয়ালের ওপরের অংশে তাক, খাটের নিচে সংরক্ষণব্যবস্থা কিংবা ভাঁজ করে রাখা যায় আসবাব জায়গা বাঁচাতে পারে। ঘরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাব বাদ দিয়ে কিছুটা খোলা জায়গা রাখলেও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক দেখায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় নকশাগুলো অনুসরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে ভুলে গেলে অবশ্য উল্টো সমস্যাও হতে পারে। কোনো ঘরে যে রং বা আসবাব সুন্দর দেখাচ্ছে, অন্য ঘরে সেটি একই রকম মানানসই না–ও হতে পারে।
এ বিষয়ে সুবর্ণা মোস্তারি বলেন, ছোট জায়গায় ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে নান্দনিকতার পাশাপাশি ব্যবহারিক দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বহুমুখী আসবাব ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে একই আসবাব একাধিক কাজে আসে। ঘরের মেঝের জায়গা বাঁচাতে দেয়ালের অংশও কাজে লাগানো যায়।
আলো ও আয়নার সঠিক ব্যবহার ঘরকে তুলনামূলক বড় ও খোলামেলা দেখাতে পারে বলে উল্লেখ করেন সুবর্ণা মোস্তারি। তিনি বলেন, ঘরের আকার ও প্রাকৃতিক আলোর কথা বিবেচনা করে রং নির্বাচন করা এবং প্রতিটি জিনিসের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখা জরুরি। এতে কম জায়গায়ও ঘর গোছানো, স্বস্তিদায়ক ও ব্যবহারবান্ধব রাখা সম্ভব।
নান্দনিকতার সঙ্গে স্বস্তিও
ঘর সাজানোর প্রবণতা বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে মানুষের রুচিও। এখন অনলাইনেই মানুষ পছন্দের নকশা দেখছেন, নিজের ঘরের জন্য ধারণা নিচ্ছেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে কিনছেন। তবে ঘর যতই আধুনিক বা নান্দনিক হোক, সেখানে স্বস্তি না থাকলে সেই সাজসজ্জার অর্থ কমে যায়।
এ বিষয়ে সুবর্ণা মোস্তারি বলেন, পিন্টারেস্টে পাওয়া ধারণা অনুসরণ করে ঘর সাজানো এবং পেশাদার ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের সহায়তা নেওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি। দুটির মধ্যে মূল পার্থক্য দেখা যায় খরচের ধরন, বাজেটের কার্যকর ব্যবহার, কাঠামোগত ঝুঁকি মোকাবিলা ও শেষ পর্যন্ত কাজের মানের ক্ষেত্রে। পিন্টারেস্ট থেকে ধারণা নেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও নিজের ঘরের জায়গা, প্রয়োজন ও কাঠামোর সঙ্গে সেই ধারণা কতটা মানানসই হবে, তা বাস্তবায়নের সময় বিবেচনা করা জরুরি।