২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল অবলোপন করা ঋণ বাদে অন্য সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে হিসাব দিয়েছে। অবলোপন করা ঋণসহ তা দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ কোটি টাকায়। দুই বছরে তা বেড়ে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এর অর্থ হলো, ব্যাংক খাতে মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি খেলাপি হয়ে গেছে। এর বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে।

খেলাপি ঋণের সঙ্গে অর্থ পাচারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নানাভাবে অর্থ পাচার হয়ে আসছে। আমদানিতে উচ্চমূল্য, রপ্তানিতে কম মূল্য দেখানো, রপ্তানি আয়ের একটা অংশ দেশে না আনা এবং হুন্ডি ব্যবস্থায় প্রবাসী আয়ের একটা অংশ বিদেশে পাচার—এই চারভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে।

অর্থ পাচার যে বাড়ছে, তার বড় প্রতিফলন রয়েছে বৈধপথে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার তথ্যে। সরকারের সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগই বলছে, এক বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। খেলাপি ঋণ বা দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার প্রভাব পড়েছে রিজার্ভে। রিজার্ভের দ্রুত পতন হচ্ছে। সঠিক হিসাব করা হলে এখন রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে দাঁড়াবে। তাহলে এক বছরের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে ২২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভে নেই। এটা গুরুতর সংকট। এর অর্থ হলো, বিপজ্জনক ধারায় বাংলাদেশ পড়ে গেছে।

অর্থ পাচার অনেক বাড়লেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করছে না। উল্টো এবারের বাজেটে ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। চার মাসে একজনও অর্থ ফেরত আনেননি। সরকারের এ সিদ্ধান্ত যে ইতিবাচক ফল দেবে না, তখনই আমরা বলেছি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সরকার পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত। যেসব দেশে বেশি পাচার হয়েছে এমন আটটি দেশেও যদি আটটি দল পাঠানো হতো, তাহলে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য পাওয়া যেত।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো রকমের কোনো তৎপরতাও দেখছি না। দুর্নীতি দমন না করলে পাচার ঠেকানো যাবে না। অর্থ পাচার ঠেকাতে না পারলে খোলাবাজারে ডলারের যে চাহিদা তা–ও কমবে না। হুন্ডি ব্যবস্থা যে চাঙা হচ্ছে, সেটিও ঠেকানো যাবে না। এমনকি আইএমএফ ঋণ পেলেও রিজার্ভের পতন থামবে বলে মনে হয় না। খেলাপি ঋণকে প্রশ্রয় দেওয়া, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া—এগুলো থেকে সরকার সরে না এলে বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।

মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক।