default-image

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদটির বেলায় ‘বদল’ই একমাত্র সত্য। যোগ্যতা, দক্ষতা, পেশাদারত্ব, সক্ষমতা—এসবই যেন এ পদের বেলায় মিথ্যা। শুধু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয়ের উল্লেখ থাকে। বাস্তবতায় এসবের কোনো চর্চাই কাজে লাগে না এ পদে। বরং পেশাদারত্ব চর্চা করতে গেলেই লাগে গন্ডগোল। অতঃপর বিদায়ই সত্য।

গত ২২ বছরে ১১ জন এমডি বদল হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল তিনজন পূর্ণ মেয়াদে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। অন্যদের মেয়াদ পূর্তির আগেই হয় স্বেচ্ছায় বিদায় নিতে হয়েছে, নয়তো বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কাগজে–কলমে এ বিদায় ‘ব্যক্তিগত কারণ’ হয়েই নথিভুক্ত হয়ে থাকে সব সময়। আসল কারণটা বরাবরই থেকে গেছে অন্তরালে। এ অন্তরালের কারণটি হলো ‘প্রভাব’। ডিএসই চালান মূলত ব্রোকারেজ হাউসের মালিক ‘ভাইয়েরা’। ডিএসইতে ২৫০টি ব্রোকারেজ হাউস থাকলেও সংস্থাটি পরিচালনায় ঘুরেফিরে আধিপত্য বিস্তার করেন হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। নিজেদের প্রতিপত্তি আর প্রভাব বিস্তারের স্বার্থে তাঁরা বারবার অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কখনো কখনো ‘ভাইদের’ বদল হয় ঠিকই। কিন্তু সংস্থাটিতে পেশাদারত্ব আর আসে না।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ব্রোকারেজ হাউসের মালিকদের এ প্রভাব ও ক্ষমতার বলয় থেকে ডিএসইকে মুক্ত করতে ২০১৪ সালে মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনাকে আলাদা বা ডিমিউচুয়ালাইজেশন করা হয়েছিল। কিন্তু ডিমিউচুয়ালাইজেশনের ছয় বছর পর এসেও ‘যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন’। কারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে মিলে নিজেদের পছন্দের স্বতন্ত্র পরিচালক বাছাই করে নিয়ে আসেন এই মালিকেরা। ফলে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা কার্যত হয়ে গেছেন মালিকদেরই প্রতিনিধি। ডিএসইর শেয়ারধারী কিছুসংখ্যক মালিক যেমন কখনো চান না সংস্থাটি পেশাদারত্বের সঙ্গে চলুক, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ডিএসইতে পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বরং ডিএসইর কিছু শেয়ারধারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা মিলেমিশে তাঁদের পছন্দের কিছু লোককে শুধু পদায়ন করেছেন স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে। যাঁদের অনেকের শেয়ারবাজারের অভিজ্ঞতা নিয়েই আছে প্রশ্ন। ফলে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা যান-আসেন, কিন্তু স্টক এক্সচেঞ্জের গুণমান, পণ্যবৈচিত্র্যের তেমন উন্নতি চোখে পড়ে না। ফলে ২০১৪ সালে হওয়া বহু কাঙ্ক্ষিত ডিমিউচুয়ালাইজেশন পড়েছে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।

গত এক যুগে ডিএসইতে এমডিসহ শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন, এ রকম অন্তত আটজনের সঙ্গে কথা হয়েছে গত দুই দিনে। সবার একটাই কথা, ‘ডিএসই চালান মূলত ভাইয়েরা।’ পেশাদারত্ব নেই সংস্থাটিতে। ভাইদের মতের বাইরে গিয়ে কিছু করতে গেলে নানা জটিলতায় পড়তে হয় এমডিকে। শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন তো এমনও বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির ধরনটাই এমন, সেখানে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করা যেকোনো এমডির জন্য দুরূহ। ডিএসইর পিয়ন থেকে শুরু করে শীর্ষ পদে স্তরে স্তরে বসানো আছে ভাইদের লোক। তাই সেখানে কোনো তথ্যই গোপন থাকে না। ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য বাতাসের আগেই যেন ভাইদের কাছে পৌঁছে যায়। নিজেদের লাভে পছন্দের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসানো হয় ‘ভাইদের প্রিয় ভাইদের’।

default-image

সর্বশেষ গত বুধবার ডিএসইর এমডি পদ থেকে কাজী সানাউল হক পদত্যাগ করেন। ওই দিনের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তাঁর এ পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। প্রভাবশালী, আলোচিত–সমালোচিত এক ভাইয়ের লোক হয়েই প্রশ্নবিদ্ধ এক নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজী সানাউল হক নিয়োগ পান। যোগ দেওয়ার আট মাস যেতে না যেতেই সেই সম্পর্কের অবনতি। ফলাফল ‘ব্যক্তিগত কারণে’ পদত্যাগ। পদত্যাগের ব্যক্তিগত কারণের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ‘ভাইদের’ স্বার্থের কথা।

১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর এক দাতা সংস্থার সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ডিএসইতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও পদটি তৈরি হয়। সংস্থাটিতে পেশাদারত্ব আনতেই মূলত পদটি তৈরি করা হয়। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদটির নাম বদলে হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মালিকদের ক্ষমতা কমিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ক্ষমতাশালী করতে এমডিকে ভোটাধিকারের ক্ষমতাও দেওয়া হয় ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইনে। কিন্তু সেই ক্ষমতার প্রয়োগ করা তো দূরে থাক, প্রভাবশালীদের বিরাগভাজন হয়ে পদ ছাড়তে হয় একাধিক এমডিকে।

১৯৯৮–২০২০ সাল—এ সময়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদটিতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে শেয়ারবাজারের আলোচিত–সমালোচিত এক পরিচালকের সময়। যিনি ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের দুই দফায় শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্তও। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসে গঠিত তদন্ত কমিটি তাঁর ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

ডিএসইর প্রথম সিইও হিসেবে ১৯৯৮–২০০০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন জি কিউ চৌধুরী। প্রথম সিইও হিসেবে তিনিও তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। এরপর ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে আট মাস দায়িত্ব পালন করেন রেজাউর রহমান। পরে ২০০১ সালে তিনি পূর্ণাঙ্গ সিইও হলেও ১০ মাস সেই পদে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। রেজাউর রহমানের বিদায়ের পর ২০০২ সালের এপ্রিল থেকে ১৭ মাস ভারপ্রাপ্ত সিইওর দায়িত্ব পালন করেন মফিজউদ্দিন আহমেদ। এরপর ২০০৩–০৮ সাল পর্যন্ত দুই দফায় দায়িত্ব পালন করেন সালাউদ্দিন আহমেদ খান। দ্বিতীয় দফায় সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর তিনিও মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদায় নেন। এরপর দায়িত্বে আসেন এ এফ এম শরিফুল ইসলাম, এক বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেননি তিনি। ২০১০–২০ সাল—এ ১০ বছরে ৬ জন সিইও ও এমডি বদল হয় ডিএসইতে। অথচ এ পদের মেয়াদ তিন বছর। তাতে ১০ বছরে ৩ জন সিইও বদল হওয়ার কথা। হয়েছে তার দ্বিগুণ।

ডিএসইর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করেন, দেশের প্রধান এ স্টক এক্সচেঞ্জটিতে পেশাদারত্বের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। পেশাদারত্ব আনতে হলে এটিকে প্রভাবশালীদের প্রভাবমুক্ত করতে হবে সবার আগে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও এসব প্রভাবশালীর বলয়মুক্ত থাকতে হবে। শেয়ারবাজারে দুই দফায় ধস ও ডিমিউচুয়ালাইজেশনের ছয় বছর পরও এ দুটি চাওয়া এখনো কেবলই আশা।

মন্তব্য পড়ুন 0