default-image

সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এক সপ্তাহব্যাপী লকডাউন কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে এটি সপ্তাহ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে পোশাকশিল্প টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে আমাদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। যদিও আমি বুঝতে পারি, সরকার কেন এমন কঠোর পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী পোশাকশিল্প একটি নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং এই পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য একটি কঠিন সময় পার করছে।

লকডাউনে যাওয়ার আগে আরও ভালো উপায় চিন্তা করা উচিত, যা আমাদের জনগণের জীবন-জীবিকা রক্ষা করবে। আমি বিশ্বাস করি, ‘লকডাউন লাইট’ অন্যান্য অনেক দেশে প্রচলিত ছিল, যা বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি এবং আর্থসামাজিক অবকাঠামোর জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে বলে আমার ধারণা। আমি মহামারি বা জনস্বাস্থ্যের কোনো বিশেষজ্ঞ নই বা আমাদের সম্মানিত স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি জানার দাবিও করি না। তবে আমার মতে কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা দরকার।

প্রথমটি হচ্ছে পোশাক কারখানার নিরাপত্তা। গত বছর এই মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে শ্রমিকদের নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, কঠোর স্বাস্থ্যকর প্রোটোকল অনুসরণ করা এবং ছয় ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে নিরাপদ কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিকদের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসহায়তা এবং চিকিৎসকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কীভাবে তাঁরা সুরক্ষিত থাকবেন, সে ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে তাঁদের অনুশীলন করানো হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের যা শেখানো হচ্ছে, বাড়িতে ফিরেও যেন তাঁরা সেসব পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন, সে ব্যাপারেও প্রতিনিয়ত তাঁদের অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে।

কারখানায় শ্রমিকদের তাপমাত্রা দিনে দুবার রেকর্ড করা হয়। কারও মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুসারে আইসোলেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। গত এক বছরে কর্মক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণে এসব কঠোর প্রোটোকলের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ত্রিশ মাসের আক্রান্তের সমীক্ষায় যার একমাত্র প্রমাণ। বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের জন্য তাঁদের কর্মক্ষেত্রকে সর্বাধিক নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে।

পোশাকশ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে বসবাস করে, যেখানে একটি ছোট্ট পরিসরে ছয় কিংবা তার চেয়ে অধিক লোকের আবাসস্থল। বাসায় থাকাকালে কি তাঁদের পরীক্ষা করা হচ্ছে? এটা অসম্ভব। তাঁরা কি কঠোর নিয়মগুলো মেনে চলছেন? এ ছাড়া বাড়িতে কাজ করার সময় সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে কি না, সে ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

বাড়িতে থাকাকালেই হয়তো তাঁরা উপসর্গবিহীনভাবে ভাইরাসটি বহন করছেন। সুরক্ষার একটি মিথ্যা আশায় আবদ্ধ হয়ে নিজেদের অজান্তেই তাঁরা তাঁদের আশপাশে ভাইরাস ছড়াতে পারেন।

জীবনের আগে ব্যবসাকে সমর্থন করে অবশ্যই আমি ভুল করছি না।
মোস্তাফিজ উদ্দিন

আমরা যদি ১৪ এপ্রিল থেকে লকডাউন করি, গত মার্চ-এপ্রিলের মতো বেশির ভাগ শ্রমিকই হয়তো ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে চলে যাবেন। আমাদের যেসব গ্রাম এখনো কোভিডমুক্ত, সেগুলোও এখন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে করে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বেড়েই চলেছে। প্রকৃতপক্ষে, জাতি তা চায় না। অবশ্যই কর্মীরা কর্মক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত, যেখানে তাঁদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে আইসোলেশনের আওতায় আনা হচ্ছে।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি সর্বাত্মক লকডাউন ভাইরাসের প্রকোপ কমানোর চেয়ে মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে। অপরদিকে সীমিত পরিসরের লকডাউন বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং উপযোগী একটি কৌশল হতে পারে বলে আমার ধারণা।

জীবনের আগে ব্যবসাকে সমর্থন করে অবশ্যই আমি ভুল করছি না। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সত্য যে আমরা যদি একটি সফল ও বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা চাই, তবে তার জন্য আমাদেরও একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি প্রয়োজন। এই সপ্তাহে যেসব দেশ ফ্যাশন স্টোরগুলো পুনরায় খোলার প্রস্তুতি নিয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাজ্য অন্যতম। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাজারগুলো পুনরায় চালু হলে ক্রয় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমরা যদি এই চাহিদা পূরণ করতে না পারি, সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগীরা এই সুযোগ লুফে নেবে। যদি ক্রয়াদেশগুলো একবার হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে তা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লেগে যাবে, যা আমরা কখনোই অবহেলা করতে পারি না। উদাহরণস্বরূপ, কম্বোডিয়ায় লকডাউন চলাকালে কারখানা বন্ধ রাখা হয়নি। এ ক্ষেত্রে কম্বোডিয়ার সরকার কারফিউ বাস্তবায়ন এবং ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করে সৃজনশীলভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমরা কি তেমন কিছু করতে পারি না?

বিজ্ঞাপন

যদি আমাদের অবশ্যই লকডাউন করতে হয়, তবে তা সীমিত পরিসরে করলেই অনেক দিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এতে করে আমরাই উপকৃত হব। মরক্কো এবং তুরস্ক একই ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করছে। যেমন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দোকান বন্ধ করা, ব্যক্তি চলাচলকে সীমাবদ্ধ করা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করা, যা মূলত সাধারণ জ্ঞান।

সর্বশেষ কঠোর লকডাউন চলাকালে অনেক কারখানাকে সমালোচনামূলকভাবে ক্রয়াদেশ সম্পূর্ণ করতে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এটি গত ১২ মাসে বহুবার ঘটেছে, যা গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করছে। এর মধ্যে অনেক গ্রাহকই হয়তো ঘন ঘন লকডাউনের কারণে পুনরায় বাংলাদেশে আসবে না। এতে পোশাকশিল্পের উন্নয়নে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

বর্তমানে সব কারখানা ঈদের আগে শিপমেন্ট সম্পন্ন করার ব্যস্ততম সময় পার করছে। এ অবস্থায় যদি লকডাউন আরোপ করা হয়, কারখানাগুলোর পক্ষে শিপমেন্ট সম্পাদন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। পশ্চিমা বিশ্বে স্কুল এবং অর্থনৈতিক সব ক্রিয়াকলাপ এই আগস্ট মাস থেকে শুরু হবে বলে ক্রেতারাও পরবর্তী তারিখে ক্রয়াদেশ নিতে প্রস্তুত নন। স্পষ্টতই, লকডাউনের প্রভাব বিশেষত পোশাকশিল্প কারখানাগুলোর জন্য এবং আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল অন্তরায়।

(প্রস্তাবিত) হার্ড কিংবা সর্বাত্মক লকডাউনের সময়টিও বেশ সমালোচিত: এটি নতুন বছরের ছুটি উদ্‌যাপনের পাশাপাশি রমজানের শুরুর সঙ্গে মিলে যায়। এখানে আরও একটি ঝুঁকি রয়েছে যে লকডাউনটি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে ভেবে শ্রমিকদের অনেকেই ঈদের পরপরই গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন, যা ভাইরাসটির সংক্রমণে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এখানে ঈদও একটি বিবেচনার বিষয়।

বর্তমানে সব কারখানা ঈদের আগে শিপমেন্ট সম্পন্ন করার ব্যস্ততম সময় পার করছে। এ অবস্থায় যদি লকডাউন আরোপ করা হয়, কারখানাগুলোর পক্ষে শিপমেন্ট সম্পাদন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

কারখানাগুলো বন্ধ থাকা অবস্থায় কি আমরা ঈদের বোনাস প্রত্যাশা করতে পারি?
কোনোভাবেই আমি আমাদের সরকারের সমালোচনা করি না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দুর্দান্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নেতৃত্ব প্রদান করছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার এমনভাবে কাজ করছে যা চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করা কার্যত অসম্ভব। এই মহামারি পরিচালনা করার বিষয়ে সরকার সর্বত্র শিখছে।

অবশ্যই, সাধারণ জীবনের এবং কঠোর লকডাউনের তুলনায় এটি কালো এবং সাদা হতে পারে না। সম্ভবত তৃতীয় একটি উপায় চিন্তা করা যেতে পারে, যেখানে পোশাক কারখানাগুলো কর্মক্ষেত্রকে বর্তমান পরিবেশের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে যাতে আমরা আমাদের বিনিয়োগ, সময় ও শ্রম কাজে লাগাতে পারি। তবে সরকার এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারককে প্রতিটি কারখানায় সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে আরও কঠোর পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ গার্মেন্টস উৎপাদনকারী এবং রপ্তানিকারকদের দ্বারা সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যাসোসিয়েশনকে (বিজিএমইএ) অত্যুক্তি করা যাবে না।

সর্বোপরি, আসুন আমরা কারফিউ প্রবর্তন করি এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধতার কঠোর বিধিনিষেধ প্রয়োগ করি। এসব এমন আত্মত্যাগ, যা আমাদের সম্মিলিত আনন্দ এবং জাতীয় কল্যাণ নিশ্চিত করবে। এর মধ্যে, আসুন দয়া করে আমাদের বিশ্বব্যাপী সমাদৃত পোশাকশিল্পের চাকাগুলো সচল রাখি, যাতে আমরা এই মহামারি থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে দুর্দান্ত উদ্যমে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে পারি।

–মোস্তাফিজ উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন