default-image

আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট আমি মনে করি সম্প্রসারণমূলক বাজেট হওয়া উচিত। সম্প্রসারণমূলক বাজেটের একটা দিক হতে পারে বাজেট ঘাটতি জিডিপির তুলনায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত করা যেতে পারে, যেটা অতীতে আমরা ৫ শতাংশ দেখে আসছি। যেহেতু করোনার প্রকোপ বেড়ে গেছে, সরকারকে অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে, সে জন্য আমি মনে করি করোনা মোকাবিলার জন্য ঘাটতি বাজেট জিডিপির ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এটা মাথায় রেখেই বাজেট তৈরি করা উচিত।

আমার মতে, এবারের বাজেটে তিনটি খাতে অগ্রাধিকার থাকা দরকার। প্রথমত, গরিব ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা। দ্বিতীয়ত, করোনার বিষয়টি মাথায় রেখে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো। চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত করা, যাতে করে করোনার পরবর্তী ধাপ আমরা মোকাবিলা করতে পারি। তৃতীয়ত, অবকাঠামো খাতে আরও ২০ শতাংশ বরাদ্দ বাড়ানো।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৩৫ লাখ পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দিয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। করোনা যেহেতু এখনই যাচ্ছে না, দরিদ্রদের নগদ টাকা বছরে চারবার দেওয়া উচিত, যাতে করোনার সময় দারিদ্র্যের অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে তারা। কারণ, করোনায় অনেক সংকট তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষদের নগদ টাকা দেওয়ার আগে ধনী-গরিবের একটা তালিকা থাকা জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) একটা তালিকা করছে বলে শুনেছি। যত দ্রুত সম্ভব তালিকাটা প্রকাশ করা জরুরি, যাতে সত্যিকারের দরিদ্র মানুষটি নগদ সহায়তার টাকাটা পায়।

বিজ্ঞাপন

আরেকটা দিকে খেয়াল রাখতে হবে সেটি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সহযোগিতা দেওয়া। কারণ, এরাই অর্থনীতির চালিকা শক্তি। সেদিক থেকে আগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখান থেকে ৭০ শতাংশ ছাড় হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যাংক মডেলে এই প্রণোদনা ছাড় হলে সফল হবে না। কারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে ব্যাংকে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। কিংবা যে প্রস্তুতি থাকা দরকার, তা নেই। সে জন্য এনজিওর মাধ্যমে মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। করোনা মোকাবিলায় সামনের অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য আরও ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করছি।

আরেকটা দিকে খেলা রাখতে হবে সেটা হলো স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানো। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য আমরা প্রস্তুত নই, যেটা স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে। আমি মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো উচিত। এই খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ থেকে ৪ শতাংশ করার উচিত, যাতে স্বাস্থ্য খাতে এখন যেসব দুর্বলতা আছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়। এই টাকা প্রয়োজনে টিকা কেনার জন্য রাখা যেতে পারে। আইসিউর জন্য রাখতে হবে। পিসিআর টেস্টের জন্যও রাখতে হবে।

তৃতীয় বিষয় হলো করোনার কারণে সরকারের অবকাঠামো খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা উচিত। কাবিখাসহ সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কারণ, গ্রামীণ দরিদ্র মানুষেরা বেশ বিপদে আছে। অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। সাময়িক কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকার যদি রাস্তাঘাট নির্মাণে আরও বেশি বরাদ্দ দেয়, তখন গ্রামাঞ্চলে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। এতে করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। এ ছাড়া মেগা প্রকল্প চালিয়ে যেতে পারে।

এসব কাজ করতে গেলে সরকারের ব্যয় বাড়বে। এই ব্যয় মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। ব্যাংকে অনেক টাকা অলস পড়ে আছে। ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে। এ ছাড়া সরকার চাইলে বৈদেশিক ঋণ নিতে পারে। বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বহুজাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে।

আমার মতে, অর্থায়নে খুব সমস্যা হবে না। বরং অর্থ খরচে একটা গাইডলাইন থাকা উচিত। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দের মাত্র ২২ ভাগ টাকা খরচ হয়েছে। এটা উৎসাহব্যঞ্জক চিত্র নয়।

আয় বাড়াতে হলে নতুন করে কর আদায়ের হার বাড়ানো ঠিক হবে না, বরং বর্তমান কাঠামো ঠিক রেখেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আরও দক্ষতা বাড়াতে হবে। নজরদারি বাড়াতে হবে তাদের। যাঁরা ধনী আছেন, তাঁদের কাছ থেকে কর আদায়ের হার বাড়াতে হবে। ভ্যাট আরও বেশি আদায় করতে হবে। করপোরেট কর আরও কমানো উচিত। এতে অনেকে স্বস্তি পাবে।

বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন