default-image

আগেরবারের লকডাউনের আলোচিত চরিত্র ছিল তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক। ২৬ মার্চ থেকে ১০ দিনের সাধারণ ছুটির ঘোষণায় দলে দলে পোশাকশ্রমিকেরা যাঁর যাঁর বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। পোশাক কারখানা খোলার নির্ধারিত তারিখ ছিল ৫ এপ্রিল। সাধারণ ছুটির কথা বলা হলেও তখন সারা দেশে কার্যত লকডাউন চলছিল, গণপরিবহনও ছিল বন্ধ। এরপরও চাকরি বাঁচাতে হাজার হাজার শ্রমিক ‘বানের লাহান’ কর্মস্থলে ফিরেছিলেন। এসে জানতে পারেন পোশাকমালিকদের সংগঠন ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখবে। এরপর আবার তাঁরা দলে দলে কর্মস্থল ছাড়েন। ফেরিঘাটের সেই উপচে পড়া ভিড় নিশ্চয়ই সবার মনে আছে।

ধরে নিলাম, আগে কখনো কেউ লকডাউন দেখেনি। তাই অভিজ্ঞতাও ছিল না। সুতরাং পরীক্ষা-নিরীক্ষাটা না হয় খেটে খাওয়া পোশাকশ্রমিকদের ওপর দিয়েই হোক। আশা ছিল, ২০২০ সালের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চয়ই সবার যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়েছে। সুতরাং পরেরবার সব ঠিকঠাক থাকবে। এমনিতেই ‘শিক্ষা নিয়েছি’ এটা আমাদের মন্ত্রীদের খুবই প্রিয় উক্তি। যেমন একবার কোরবানির চামড়া নিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড হলো, এক মন্ত্রী বললেন, ‘চামড়া নিয়ে এবার আমার শিক্ষা হয়েছে।’ আর সেই শিক্ষা পরেরবার কাজে লাগাবেন। যথারীতি পরেরবার একই ঘটনা ঘটল। আবার পেঁয়াজ নিয়েও একই কাণ্ড। আবারও মন্ত্রী বললেন, এবার শিক্ষা হলো, পরেরবার আর হবে না। কিন্তু ঠিকই পেঁয়াজ নিয়ে একই ঘটনা ঘটেছিল।

বিজ্ঞাপন

লকডাউন নিয়েও যে আমাদের কারও কোনো শিক্ষা হয়নি, তার প্রমাণ তো এখন প্রতি পদে পাওয়া যাচ্ছে। আবার লকডাউন আসছে—সরকারের প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্তের ঘোষণাটি প্রথম এল দলের সাধারণ সম্পাদক, সেতুমন্ত্রীর কাছ থেকে। এরপর অন্য মন্ত্রীরা কথা বলা শুরু করলেন। মন্ত্রীরা যা বললেন, তার অর্থ দাঁড়ায়, এবার হবে সর্বাত্মক লকডাউন। তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে যে প্রজ্ঞাপনটি দেওয়া হয়েছে, সেখানে আবার লকডাউন কথাটি পুরোপুরি উধাও। বরং প্রজ্ঞাপন পড়ে জানা গেল, আসলে আসছে চলাচলে বিধিনিষেধ, যার নাম আগের বছর ছিল সাধারণ ছুটি। মহামারির সংক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিরা তাতেই সম্মত ছিলেন।

যেহেতু আগের বছরে আলোচনাজুড়ে ছিল তৈরি পোশাক খাত, সুতরাং প্রথমে নড়াচড়া শুরু করলেন পোশাকমালিকেরাই। তাঁদের অগ্রাধিকার ব্যবসা বা জীবিকা। তাঁদের দাবি পুরোপুরি পেশ করার আগেই তা মেনে নেয় সরকার, অর্থাৎ খোলা থাকবে কলকারখানা। রপ্তানিমুখী কলকারখানা খোলা থাকবে কিন্তু বন্ধ থাকবে ব্যাংক—অতি আশ্চর্যজনক এই সিদ্ধান্ত এল সরকারের কাছ থেকেই, প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। সাত দিনের জন্য ব্যাংক বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত তো রীতিমতো গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার মতো। ব্যাংক মানে লাইন ধরে টাকা জমা বা উত্তোলন নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনও জড়িত। তা ছাড়া একটা দেশে ব্যাংক খোলা রাখা দরকার, না বন্ধ থাকবে—সেই সিদ্ধান্ত তো আসতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে, কিন্তু তা হয়নি। বিনা বাক্যে সরকারের সব সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশ ব্যাংক চালু রেখেছে, এটা তারই প্রতিফলন।

ব্যাংক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের এক দিন পরে, আজ মঙ্গলবার আবার বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সম্ভবত এক দিন পরে তারা বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছে। সুতরাং খোলা থাকবে ব্যাংক। তাহলে আজ দীর্ঘ সময় ধরে লাইন দিয়ে অসংখ্য মানুষ ব্যাংকের লেনদেন করল, তাদের সময়ের দামের কী হবে? এসব কারণেই ২০২১ সালের লকডাউনের আলোচিত চরিত্র হচ্ছে ব্যাংক বা ব্যাংকার।

নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ, যারা লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পরিচালনা করে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের সফল হয়েছে, তারা ‘লকডাউন ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি কোর্স চালু করতে পারে। বিদেশ সফরে আগ্রহী সরকারি লোকজন তাহলে কিছুটা হলেও শিখতে পারতেন। অবশ্য মহামারির এই সময়ে সফর বাদ দিয়ে অনলাইনে তাঁরা এই কোর্স করতে আগ্রহী হতেন কি না, সেটা একটা প্রশ্ন।

বাংলাদেশের পক্ষে কি আদৌ লকডাউন ব্যবস্থাপনায় সফল হওয়া সম্ভব? এমনকি কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানানোও কি সম্ভব ছিল? দুটি বিষয় নিয়েই সন্দেহ আছে। আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেন জীবনের চেয়ে জীবিকাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সম্ভবত ২০২০ সালের অভিজ্ঞতা। অর্থনীতির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণা দেয়। এখন পর্যন্ত এর অর্ধেক বাস্তবায়ন হয়েছে। আবার প্রণোদনার বেশির ভাগ পেয়েছে বড়রাই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা সহায়তা পেয়েছেন সামান্যই। এর বাইরে আছেন অসংখ্য পেশাজীবী, আছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের অসংখ্য উদ্যোক্তা—তাঁরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। তাঁরা জেনে গেছেন, সরকারি সহায়তা তাঁদের জন্য নয়। সুতরাং নিজের জীবিকা নিজেকেই দেখতে হবে। এ কারণেই হয়তো জীবনের চেয়ে জীবিকার প্রতি পক্ষপাত তাঁদের বেশি।

বিজ্ঞাপন
default-image

এমনিতে টিকা ব্যবস্থাপনায় সরকার ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। এর বাইরে করোনাসংক্রান্ত অন্য কোনো ক্ষেত্রে সে পরিমাণ সফলতা আছে তা বলা যাবে না। সংক্রমণ বাড়ছে না কমছে—তার পরিষ্কার চিত্র কখনোই জানা যায়নি। যাঁরা পরীক্ষা করেন, তাঁদের মধ্যে কতজন সংক্রমিত, সেটাই একমাত্র পরিসংখ্যান। তবে প্রবণতা দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়। আর ঢাকা বা চট্টগ্রামসহ বড় শহরের বাইরে টেস্ট করার প্রবণতা এমনিতেই কম। গ্রামগঞ্জের সঠিক খবর পাওয়া যায় না বললেই চলে। সুতরাং কঠোর বা সর্বাত্মক লকডাউনের আগে যে হারে মানুষ কেনাকাটা করে দলে দলে ঢাকা ত্যাগ করেছেন, তাতে সামনের দিনে গ্রামগঞ্জের চেহারা কী হবে, তা সম্ভবত জানা যাবে না কোনোকালেই। অন্তত সরকারি পরিসংখ্যানে সে চিত্র থাকবে না। রাজধানীর বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ায় ঢাকার সংক্রমণ কমে এলে হয়তো বাহবাও দেওয়া যাবে। বলা হবে, অবশেষে সংক্রমণ কমানো গেছে।

পাদটীকা:

একের পর এক সিদ্ধান্ত বদলে লকডাউন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরস কম হচ্ছে না। সবচেয়ে চালু রসিকতাটা এ রকম—
১৪ এপ্রিল থেকে—কঠোর লকডাউন।
২১ এপ্রিল থেকে—পুরোপুরি লকডাউন।
২৩ এপ্রিল থেকে—শতভাগ লকডাউন।
২৫ এপ্রিল থেকে—সর্বোচ্চ লকডাউন।
২৬ এপ্রিল থেকে—সিরিয়াস লকডাউন।
২৮ এপ্রিল থেকে—পুরোপুরি সিরিয়াস লকডাউন।
৩০ এপ্রিল থেকে—বিশ্বাস করেন, লকডাউন।
৬ মে থেকে—সত্যি সত্যি অরিজিনাল লকডাউন।

দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত চরিত্র। বাংলায় ‘তুঘলকি কাণ্ড’ নামে যে বাগধারাটি রয়েছে, তার উৎপত্তি এই মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আজব কাণ্ডকারখানা থেকেই। দেশের মানুষ নিশ্চয়ই বাগধারাটি এবার ভালোভাবে বুঝতে পারছেন।

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন