পাটেশ্বরী: বাঙালির প্রধান অর্থকরী ফসলের গল্প

বিজ্ঞাপন
default-image

ধলসুন্দর, বাও, বিদ্যাসুন্দর, কেউত্রা, পাইধা, কাইটাবাও, কাজলা—এগুলো আমাদের গর্বের নাম, যার গরবে বাঙালি গর্বিত ছিল বহুকাল। পাকেচক্রে সে গর্ব এখন বিগত। সোনারং পাট আনত কাঁচা টাকা। আর সে টাকায় সমৃদ্ধ হয়েছিল একটি পুরো জাতি! সে জন্যই তার নাম ছিল ‘সোনালি আঁশ’। প্রায় দুই শ বছর পৃথিবীকে একচ্ছত্রভাবে পাটের জোগান দিয়ে গেছে এই বাংলাভূমি। এখন গল্পের মতো শোনালেও সেটাই ছিল বাস্তবতা।

প্রাচীন বইপত্রে সূক্ষ্ম পট্টবস্ত্র বা পাটের শাড়ি, পাটশাকের তরকারি কিংবা বিদেশি ভ্রমণকারীদের বর্ণনায় পাটের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে শত শত বছর ধরে বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলে পাট উৎপন্ন হতো এবং সে পাট অর্থনৈতিকভাবে বাংলা অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, যব এবং নানা ধরনের ডাল। এগুলো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত হলেও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ফলত সবচেয়ে বেশি। কারণ, পলিবিধৌত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা প্রাকৃতিকভাবে উর্বর অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা এবং উজানের আসাম অংশের ব্রহ্মপুত্র, বিশেষ করে ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া জেলার ব্রহ্মপুত্র সন্নিহিত অঞ্চলগুলো বিশ্বের প্রধান পাট উৎপাদনের এলাকা। কিন্তু এই বিপুল পাট দেশীয় চাহিদা মেটালেও একটা দীর্ঘ সময় বাংলার প্রধান অর্থকরী সম্পদ হয়ে ওঠেনি। পাট বাংলার প্রধান অর্থকরী ফসল হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক ঘটনা জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে দুটি যুদ্ধও আছে!

default-image

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পাটের আন্তর্জাতিক বাজার
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের কাঁচা পাটকে সর্বপ্রথম একটি কৃষিপণ্য হিসেবে বাজারজাত করে। ফলে পাট আন্তর্জাতিকভাবে একটি রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে বিশ্বের বাজারে পরিচিতি পায়। কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা জাহাজের জন্য শক্ত রশি তৈরি করার কাজে কোন ধরনের তন্তু কার্যকরি হবে, তার খোঁজ করছিলেন বেশ আগ্রহের সঙ্গে। শেষে তাঁরা এ দেশের পাটকে আবিষ্কার করলেন জাহাজের মজবুত রশি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে। কোম্পানির লোকেরা যখন পাট দিয়ে জাহাজের রশি তৈরির কথা চিন্তা করছেন, তখনো বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালু হয়নি।

যাহোক, বেঙ্গল বোর্ড অব ট্রেডের উদ্যোগে সর্বপ্রথম ১৭৯১ সালে পাটের নমুনা পাঠানো হয় ইংল্যান্ডে। কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরস পাঠানো পাটের নমুনা দেখে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এরই ফলে ১৭৯৩ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এক হাজার টন কাঁচা পাট ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়। এর তিন বছর পর ১৭৯৬ সালে, বাংলা থেকে ৬৫ টন কাঁচা পাট দ্বিতীয়বারের মতো রপ্তানি করা হয়েছিল ইংল্যান্ডে। একই বছর ৪০ টন পাট জার্মানিতে এবং ৬ টন পাট যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও বাংলা থেকে পাট রপ্তানি হতে থাকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়।

সে আমলে পাট থেকে প্রস্তুত করা হতো জাহাজের রশি, পাকানো দড়ি, পাপোশ, ডোর ম্যাটস ইত্যাদি। এর কয়েক বছর পরেই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়ে গেল পাটকে কেন্দ্র করে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ার জেলার অ্যাবিংডনে ১৮২০ সালে পাটের তন্তু থেকে সুতা তৈরির কৌশল উদ্ভাবন হয়। এ ঘটনার কয়েক বছর পর ১৮৩৫ সালে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি নামক শহরে বিশ্বের প্রথম পাটের কারখানায় পাটের তন্তু বা আঁশ থেকে সুতা তৈরি করে বাজারজাতকরণ শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে সে সময় থেকেই ইংল্যান্ডে পাটের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে শুরু করে।

কফি ব্যাগ তৈরি
ইংরেজদের মতো ডাচরাও বহির্বিশ্বে বাংলার পাটের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ডাচদের উপনিবেশগুলোয় কফি উৎপাদন হতো। ১৮৩৮ সালে ডাচ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, শণের পরিবর্তে কফি ব্যাগ তৈরি হবে পাট দিয়ে। এ ঘটনায় বহির্বিশ্বে পাট রপ্তানির কার্যক্রম আরও প্রসারিত হয়।

বাংলার অভ্যন্তরীণ রপ্তানিমুখী শিল্প
পূর্ববঙ্গের, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলায় পাটের সুতা থেকে বয়নশিল্পীরা উন্নত মানের কাপড়সহ পাটজাত নানা ধরনের পণ্য তৈরি করতেন। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হতো সেসব পণ্য। স্থানীয়ভাবে পাটের আঁশ থেকে পাওয়া সুতায় তৈরি কাপড় ইউরোপের যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স; উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বার্মা, জাভা, চীন এসব দেশে রপ্তানি হতে থাকে। ১৮৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হস্তচালিত তাঁতে উৎপন্ন সর্বমোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭১৩ পিস কাপড় উল্লিখিত দেশগুলোয় রপ্তানি হয়েছিল। সে আমলে এর বাজারমূল্য ছিল ২ লাখ ১৫৯ হাজার ৭৮২ রুপি।

default-image

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, রাশিয়ার ফ্ল্যাক্স এবং আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
১৮২০ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে স্কটল্যান্ডে পাটের সুতা আবিষ্কার হয়ে গেছে। সে সুতা দিয়ে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরের টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে সীমিত পরিসরে বিভিন্ন রকম পণ্য তৈরিও শুরু হয়ে গেছে তত দিনে। তারপরও ডান্ডির টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি ছিল ফ্ল্যাক্স–নির্ভর। রাশিয়া থেকে ফ্ল্যাক্স ডান্ডির মিলগুলোয় রপ্তানি হতো।

এ সময় তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে শুরু হয় ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৩-১৮৫৬)। ১৮৫৩ সালে তুরস্কের সহায়তায় এগিয়ে আসে ইংল্যান্ড। এর ফলে রাশিয়া ইংল্যান্ডে ফ্ল্যাক্স রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় পাটের ভাগ্য খুলে যায়। ফ্ল্যাক্স তন্তুর বিকল্প হিসেবে ব্রিটিশ ভারতের পাট তন্তু ব্যবহার করা শুরু হয় বিভিন্নভাবে, যে পাটের বেশির ভাগ উৎপন্ন হতো বাংলায়।

এর পাঁচ বছরের মধ্যে পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে শুরু হয় আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-১৮৬৫)। এর ফলে সরাসরি পাটের গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফেডারেল ও কনফেডারেট এ দুটি বাহিনী লড়ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। পরস্পর যুদ্ধরত এ দুটি দলের সৈন্যবাহিনীর জন্য ব্যাপক প্রয়োজন দেখা দিল পাটের তৈরি ব্যাগের। আগে উভয় সেনাবাহিনী তুলা থেকে তৈরি ব্যাগ দিয়ে প্রয়োজন মেটাত। তুলার ব্যাগের চেয়ে গানি ব্যাগ বা পাটের তৈরি ব্যাগ অনেক বেশি কার্যকর হওয়ার ফলে উভয় দল যুদ্ধ চলাকালীন প্রচুর পরিমাণে পাট বাংলা থেকে আমদানি শুরু করে। উনিশ শতকের এসব আন্তর্জাতিক ঘটনা বাংলার পাটকে আরও বেশি বৈশ্বিক করে তোলে।

এর প্রমাণ মেলে উনিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে। উল্লিখিত সময়ে বাংলায় পাটের চাষ ও চাষের আওতাধীন মোট জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।

বছর জমির পরিমাণ/ একর রপ্তানি/মণ
১৮৩৫-১৮৪০ ৮,৩৫৭ ১২৫,৩৬২
১৮৪০-১৮৪৫ ১৫,৮৪২ ২৩৭,৬৩৯
১৮৪৫-১৮৫০ ১৯,৩৬৫ ২৯০,৪৭৭
১৮৫০-১৮৫৫ ৪৮,৭৭০ ৭৩১,৫৪৭
১৮৬০-১৮৬৫ ১৮২,৪১৭ ২,০০৩,৪১৭

পরিসংখ্যান জানিয়ে দিচ্ছে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, আমেরিকা গৃহযুদ্ধ এবং পাটের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ফ্লাক্সের চেয়ে অনেক কম হওয়ার কারণে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায়, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা অববাহিকায় পাট চাষে রীতিমতো বিপ্লব এনে দিয়েছিল। পাট চাষের ইতিহাসে এটি অভূতপূর্ব ঘটনা।

default-image

পাটকল স্থাপন এবং চটের বস্তা তৈরি
পাটের গুরুত্ব বাড়ার জন্য পৃথিবীব্যাপী পাটকল স্থাপন এবং চটের বস্তা তৈরি শুরু হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর ফলে রাতারাতি পাটের প্রয়োজন বিশ্ববাজারে বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এ সময় পূর্ববঙ্গসহ সমগ্র বাংলা এবং আসামের ব্রহ্মপুত্র সন্নিহিত কয়েকটি জেলায় পাটের চাষ শুরু হয় ব্যাপকভাবে। প্রকৃতপক্ষে এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে পাটের চাষ শুরু হয় ১৮৩৮ সাল থেকে। এরপরেই বাংলার বিভিন্ন নদীবন্দরে, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা তীরবর্তী নদীবন্দরগুলো কাঁচা পাটের বড় মোকাম হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে পাটের কারবারিরা এ দেশে আসতে শুরু করে এ সময়। এরা কাঁচা পাটের বেল বা বড় বড় গাঁইট বাঁধার জন্য মেশিন নিয়ে এসে নৌবন্দরগুলোয় স্থাপন করে।

১৮৫৪ সালে হুগলির নিকটবর্তী রিষড়া নামক স্থানে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম পাটকল স্থাপিত হয়। জর্জ অকল্যান্ড নামক একজন সিলোন কফি বাগানের মালিকের উদ্যোগে এ পাটকলটি স্থাপিত হয়েছিল। এর নাম ছিল বেঙ্গল অকল্যান্ডস মিল। এটি উৎপাদন শুরু করে ১৮৫৫ সালে। এর কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর বহু স্থানে একের পর এক পাটকল স্থাপিত হতে থাকে। ১৮৫৭ সালে ফ্রান্সে জুট স্পিনিং মিল চালু হয়। জার্মানি, বেলজিয়াম এবং অস্ট্রেলিয়ায় যথাক্রমে ১৮৬১, ১৮৬৫ ও ১৮৭০ সালে পাটকল স্থাপন হয়। এই মিলগুলোর কাঁচামালের একমাত্র জোগান ছিল বাংলার পাট। সে সময়কার ব্রিটিশ ভারত সরকারের একটি নীতিমালা ছিল, বিনা শুল্কে পৃথিবীর যেকোনো দেশের ব্যবসায়ীরা বিনা বাধায় বাংলাদেশ থেকে পাট কিনে যেকোনো দেশে নিয়ে যেতে পারতেন। এভাবেই সমগ্র বিশ্বের পাটের চাহিদা এককভাবে বাংলার মাধ্যমেই মেটানো হতে থাকে।

ব্রিটিশ ভারতে বর্তমান বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ ছিল বৃহত্তর বাংলায় পাটের বড় মোকাম। এর পরেই ছিল ভৈরববাজার ও চাঁদপুরের অবস্থান। এই বন্দরগুলোতে ইউরোপীয়, ভারতীয় এবং দেশি পাট ব্যবসায়ীরা একাধিক জুট প্রেসিং ও বেলিং যন্ত্র স্থাপন করেন। ফলে শত শত মানুষ এসব জায়গায় বিভিন্ন ধরনের কাজ করার সুযোগ পায়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পূর্ববঙ্গে পাট উৎপাদন হলেও ১৯৫০ সালের আগে এই অঞ্চলে কোনো পাটকল ছিল না।

প্রখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী আদমজি ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে প্রথম জুটমিল স্থাপন করে। এর অল্প দিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে সব মিলিয়ে ৯টি পাটকল নির্মিত হয়। এ মিলগুলোয় তৈরি হতো চট ও চটের বস্তা। এগুলোর কাঁচামাল ছিল ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা-মেঘনা ও তিস্তা অববাহিকায় উৎপাদিত পাট। এভাবে নতুন নতুন জুটমিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের নারায়ণগঞ্জ, খুলনা (দৌলতপুর), টঙ্গী, সিরাজগঞ্জ, যশোর ও চট্টগ্রামে গড়ে উঠতে থাকে। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে গঙ্গা তীরবর্তী পশ্চিম বাংলার অনেক পাটকল এ সময় বন্ধ হয়ে যায়।

default-image

পাটকলগুলো শুধু বস্তা উৎপাদনের মধ্যে তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখেনি। পাটের সুতা দিয়ে উন্নত মানের ম্যাট ও কার্পেটও উৎপাদন করত তারা। পাট দিয়ে শুধু যে চটের বস্তা তৈরি হতো, তা নয়। ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের অনেক জেলায় পাটের মণ্ড প্রস্তুত করে কাগজ তৈরি করা হতো। ময়মনসিংহের আটিয়ায় ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম পাট থেকে কাগজ তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন এই এলাকার কয়েকজন অগ্রগামী মানুষ।

পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী ইংরেজ এবং ডাচদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ও আমেরিকার গৃহযুদ্ধ এবং ব্যাপক কারিগরি উন্নতি—এসব কারণে বাংলার পাট প্রায় পুরো পৃথিবীতে রাজত্ব করে আনুমানিক দুই শ বছর। এরপর অবশ্য ১৯৩০ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পাট রপ্তানির বজারে ক্ষতি ডেকে আনে ভীষণভাবে। ১৯৪৪-৪৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যানমতে জানা যাচ্ছে যে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে উৎপাদিত পাটের মধ্যে শুধু বৃহত্তর বাংলায় উৎপাদিত হতো শতকরা ৮১.৬ ভাগ পাট। অবশিষ্ট পাট উৎপাদন হতো বিহার, আসাম, ওডিশা, বর্তমানের উত্তর প্রদেশ, বোম্বে এসব এলাকায়।

সে সময়কার পাক-ভারত উপমহাদেশের বাইরেও বেশ কয়েকটি দেশে পাট উৎপাদিত হতো। তবে তার পরিমাণ ছিল সামান্য। এই দেশগুলো হচ্ছে তখনকার ফরমোজা বর্তমানের তাইওয়ান, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইরান, মিসর, সুদান, তুরস্ক, পশ্চিম আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপ, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল ও মেক্সিকো। ১৯৪০ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ ভারতে সে বছর ৪০ হাজার টন পাট উৎপাদিত হয়েছিল। এর তুলনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের সম্মিলিত উৎপাদন ছিল মাত্র শতকরা ২.৬ ভাগ।

default-image

পাট এবং বাঙালি
বিশ্ববাজারে পাটের ক্রমাগত চাহিদা এবং ব্রিটিশ ভারতের সরকার কর্তৃক পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার ফলে পাট তৎকালীন বাংলায় একটি শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় দ্রুততার সঙ্গে। এ ব্যবসায় লাভবান হতে থাকেন ইউরোপীয় বণিকশ্রেণিসহ এ দেশের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শুধু তা–ই নয়, এই ব্যবসা সামনে রেখে বাংলায় ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার ও দালাল শ্রেণির সৃষ্টি হয়। নদীতীরবর্তী শত শত গঞ্জ, বন্দর মুখর হয়ে ওঠে পাট বাণিজ্যের সংস্পর্শে এসে। ‘শিপার’ নামক বিদেশি পাট রপ্তানিকারকদের আবির্ভাব ঘটে সে সময়ে।

পাটের ব্যবসায় শুধু ব্যবসায়ীরাই যে এককভাবে সম্পদের মালিক হয়েছিলেন, তা নয়। পাট উৎপাদন করে বাংলার নিম্ন–মধ্যবিত্ত এবং ধনী কৃষককুল যারপরনাই উপকৃত হয়েছিলেন। কৃষিপণ্য বিক্রি করে উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় করা যায়—বাংলার কৃষকেরা এ কথা স্বপ্নেও কোনো দিন ভাবতে পারেননি। যুগ যুগ ধরে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বাংলার লাখ লাখ কৃষক পরিবার পাট উৎপাদন করে কার্যকরভাবে সর্বপ্রথম আর্থিক সচ্ছলতার পথে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সন্ধান পেয়েছিলেন। বিশেষ করে তৎকালীন বাংলার অনগ্রসর হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠী পাট নামক এই ‘ক্যাশ ক্রপে’র কল্যাণে নিজেরা কোমর শক্ত করে দাঁড়াতে পেরেছিল। তারা নিজেদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর উচ্চাশা পূরণ করতে সক্ষম হয় ধীরে ধীরে। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শুরু, এই সময়কালের মধ্যে বাংলার হাজার হাজার মুসলিম পরিবারের শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে মূলত পাট বিক্রির টাকায়। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া সমগ্র বাংলার বৃহৎ এই সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁরা ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁরাই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিভিন্ন পরিবর্তনের।

ফলে পাট বাঙালির জীবনে শুধুই একটি অর্থকরী ফসল নয়। এটি বাঙালিকে সমৃদ্ধ করেছিল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে। আজ যখন ‘পরিবেশবান্ধব’ উপকরণের চাহিদা রয়েছে পুরো পৃথিবীতে, তখন আমরা আমাদের পরিবেশবান্ধব ফসলটির সব সম্ভাবনা গলা টিপে হত্যা করেছি। আমরা কি এতটাই আত্মঘাতী?

সূত্র:
1. Nafis Ahmed : An Economic Geography of East Pakistan : Oxford University Press, London-Page 108, 109

2. Sinha : The Economic Annals of Bengal, London 1927, P-259.

3. A.J. Warden : 'The Linen Trade' : Longman, Roberts and Green, London, 1864, PP. 646-653

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন