default-image

করোনার শুরুর দিকে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছিল। তখন রাজস্ব আদায় প্রায় তলানিতে ঠেকেছিল। ওই সময়ে প্রায় সবকিছু বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখা হয়। তবু রাজস্ব আদায় খুব বেশি হয়নি। ফলে গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) আগেরবারের চেয়ে ৫০ শতাংশের মতো রাজস্ব আদায় কমে যায়। পরের তিন মাসে সেই অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আগেরবারের চেয়ে রাজস্ব আদায় কিছুটা বেড়েছে। সর্বশেষ তিন মাসের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। অবশ্য প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি আছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে শিগগিরই অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদেরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, গত তিন মাসে আগের চেয়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে। করোনার প্রভাব কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কিন্তু গত তিন মাসে ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। এর মানে, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙা হয়নি। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙা হতে আরও ছয় মাস লাগতে পারে। তবে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এবার দেখা যাক, করোনার শুরুতে রাজস্ব আদায় কেমন ছিল। সাধারণত অর্থবছরের শেষ দিকে অর্থাৎ এপ্রিল, মে ও জুন মাসে রাজস্ব আদায় ভালো হয়। এই সময়ে আগের মাসগুলোর তুলনায় রাজস্ব আদায়ে গতি থাকে। লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখে এই সময়টি। কিন্তু করোনা এবার ‘সোনালি সময়’টি খেয়ে ফেলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল-জুন সময়ে মাত্র ৫২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে ৭০ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। আগেরবারের চেয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। মূলত গত এপ্রিল-জুন সময়ে আমদানি-রপ্তানিতে গতি ছিল না; দোকানপাট বন্ধ ছিল। অর্থনীতি প্রায় থমকে দাঁড়ায়। এসব কারণে শুল্ক-কর আদায় কমে যায়।

পরের তিন মাসে কী হলো

পরের তিন মাসে দোকানপাট খুলতে শুরু করে। আমদানি-রপ্তানিও বাড়তে থাকে। ফলে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতিও বদলে যেতে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে যত রাজস্ব আদায় হয়েছিল, তার চেয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়। এই সময়ে নতুন বিনিয়োগ কিংবা নতুন ব্যবসা চালু হয়নি বললেই চলে। তবু আগের বছরের চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হওয়ার মানে, অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেচাকেনা, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হচ্ছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সব মিলিয়ে ৪৯ হাজার ৯৯০ কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায় হয়। আগেরবারের একই সময়ে ৪৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছিল। আগের প্রান্তিকের খারাপ অবস্থা কাটিয়ে রাজস্ব খাত এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

মাসওয়ারি হিসাবে করোনাকালের গত ছয় মাসে কেমন ছিল শুল্ক-কর আদায় পরিস্থিতি, তা দেখা যাক। গত ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল গত এপ্রিল মাসে। ওই মাসে মোটা দাগে সবকিছুই বন্ধ ছিল। কিছু অতিপ্রয়োজনীয় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। যেমন সুপারশপ, ওষুধের দোকানপাট ইত্যাদি। বেশির ভাগ কলকারখানাও বন্ধ ছিল। আমদানি-রপ্তানি নামমাত্র সচল ছিল। এপ্রিল মাসে মাত্র ৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এটি সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে মাসওয়ারি হিসাবে সবচেয়ে রাজস্ব আদায়। মে মাসের শেষ দিকে সীমিত পরিসরে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খোলা শুরু করে। এতে শুল্ক-কর আদায় কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা হয়। জুন মাস ছিল গত অর্থবছরের শেষ মাস। ওই মাসে অর্থনীতি খুলতে শুরু করে এবং লক্ষ্যের কাছাকাছি এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের তাগিদও বাড়ে। জুন মাসে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। সব মিলিয়ে পুরো অর্থবছরের আদায় দাঁড়ায় ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম। সার্বিকভাবে ৮২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়। করোনার কারণে এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়ে এনবিআর।

বিজ্ঞাপন

উৎপাদনের সঙ্গে ভোগের সম্পর্ক আছে। ভোগের চাহিদা না থাকলেও বেচাকেনা হবে না। বেচাকেনা না হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে না। আবার ভোগের চাহিদা না থাকলেও উৎপাদনও কমবে। উৎপাদন কমলে কাঁচামাল আমদানিও কমে যাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে দেখা গেছে, গত এপ্রিল-জুন সময়ে ওষুধ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সাবান, ডিটারজেন্ট ছাড়া অন্য পণ্যের উৎপাদন বাড়েনি। উৎপাদন না বৃদ্ধির তালিকায় আছে পোশাক, রড, সিমেন্ট, লবণ, তেল, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি। ১৭টি পণ্য দিয়ে উৎপাদন খাতের চিত্র তুলে ধরে বিবিএস। কিন্তু পণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এপ্রিল-জুন সময়ে সরবরাহ ও বিক্রি পর্যায়ে আগের মতো শুল্ক-কর আদায় করতে পারেনি এনবিআর।

জুলাই মাস থেকে এনবিআরের রাজস্ব আদায় অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যদিও তা লক্ষ্য অনুযায়ী হয়নি। গত জুলাই মাসে ১৪ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়। আগস্টে তা বেড়ে ১৫ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা হয়। পরের মাসে রাজস্ব আদায় বাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর মাসে ১৯ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। গত কয়েক বছরের রাজস্ব আদায়ের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতি মাসে গড়ে ১৪ থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়। তবে এবার এনবিআরকে আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা বা ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।

প্রথম তিন মাসে রাজস্ব পরিস্থিতি

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে আমদানি পর্যায়ে। এই খাত থেকে ১৫ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ঘাটতি হয়েছে ৫ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ওই তিন মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ১৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। এ খাতে সবচেয়ে বেশি ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

আমদানি পর্যায়ে পর আয়কর ও ভ্রমণ কর বাবদ প্রত্যক্ষ কর আদায় হয়েছে বেশি। এই খাতে আদায় ১৫ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এই খাতে ঘাটতি ২ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা। গতবার একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১৫ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ভ্যাট খাতে। এই খাতে আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ১১১ কোটি টাকা। গতবার একই সময়ে এই খাতে আদায় ছিল ১৭ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রতি মাসে গড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। আগামী ৯ মাসে আদায় করতে হবে মোট ২২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

মন্তব্য পড়ুন 0