বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আর জিডিপি হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দেশের অভ্যন্তরে বা ভৌগোলিক সীমানার ভেতর বসবাসকারী সব জনগণ কর্তৃক উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্মের অর্থমূল্যের সমষ্টি। অর্থাৎ ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী দেশের সব নাগরিক ও বিদেশি ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্মের মূল্য অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে বিদেশে অবস্থানকারী ও কর্মরত দেশের নাগরিক, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের আয় অন্তর্ভুক্ত হবে না। এবার আসা যাক মাথাপিছু আয় প্রসঙ্গ। মূলত, একটি দেশের মোট আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলেই মাথাপিছু আয়ের হিসাব পাওয়া যায়।

অর্থনীতির এ সংজ্ঞা এখনো যাঁরা বোঝেননি, পরিষ্কার কোনো ধারণা করতে পারেননি, তাঁদের জন্য অবশ্য সুখবর আছে। আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী বিষয়টি কিন্তু পানির মতন বুঝিয়ে দিয়েছেন, যাকে বলে ‘জলবৎ তরলং’। এই যেমন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গতকাল রোববার সুনামগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘রাত পোহালেই আয় বাড়ছে, আমরা অজান্তেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি।’ আসলে এটাই হচ্ছে জিডিপি ও মাথাপিছু আয়। অর্থাৎ আপনি যে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেলেন, তাও আপনার নিজেরই অজান্তে—এটাই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। আপনি শুনলে আরও চমৎকৃত হবেন যে করোনাকালের দুই বছরেই কিন্তু আপনি বেশি বড়লোক হয়েছেন।

এখন থেকে জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মাথাপিছু আয় গণনা করা শুরু হয়েছে ২০১৫-১৬ নতুন ভিত্তিবছর ধরেই। এতেও কিন্তু আপনি রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেছেন, অবশ্যই নিজের অজান্তে। যেমন নতুন ভিত্তিবছরের হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ ডলার।

উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলা যাক। যেমন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার। এর পরই বিশ্বজুড়ে দেখা দেয় কোভিড-১৯–এর সংক্রমণ। বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে কোভিড, অচল হয় অর্থনীতি, আয় কমে যায় মানুষের। অথচ দেখা গেল এই কোভিডের মধ্যেই দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে গিয়েছিল ১৫৫ ডলার, বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলার। আপনি কি ২০২০ সালে টের পেয়েছিলেন যে আপনার মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা? পরিকল্পনামন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, নিজের অজান্তে যে বড়লোক হওয়া যায়, প্রমাণিত হলো তো?

এবার রাত পোহালে আরও বড়লোক হওয়ার আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। পরিকল্পনামন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ঠিক করেছে, জিডিপি হিসাব করার ভিত্তিবছর বদলাতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন ভিত্তিবছর ঠিক করা হয়েছে ২০১৫-১৬, আগের ভিত্তিবছর ছিল ২০০৫-০৬। ফলে, এখন থেকে জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মাথাপিছু আয় গণনা করা শুরু হয়েছে এই নতুন ভিত্তিবছর ধরেই। এতেও কিন্তু আপনি রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেছেন, অবশ্যই নিজের অজান্তে। যেমন নতুন ভিত্তিবছরের হিসাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ২২৭ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। অর্থাৎ কলমের এক খোঁচায় আপনার আয় বেড়ে গেছে ৩২৭ ডলার বা ২৯ হাজার ৪৩০ টাকা।

সরকারের নীতিই হচ্ছে যাদের আছে, তাদের আরও দাও। অর্থাৎ বড়লোক যত ধনী হবে, ততই উন্নয়ন চুইয়ে পড়বে ছোটলোকদের মধ্যে। বড় বড় প্রকল্প বানাও, এতে খরচ বাড়বে, জিডিপিও বাড়বে।

সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে ২৩ শতাংশ, আর এর প্রভাবে পরিবহনভাড়া বেড়েছে ২৭ শতাংশ। এতে আপনার কিন্তু ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। রোজকার যাতায়াতের ভাড়া তো বাড়বেই, এর প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। এ কারণে বাড়তি দাম দিয়ে আপনাকে বাজার করতে হবে। সব মিলিয়ে আপনার জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। কিন্তু আপনি কি জানেন, এর ফলেও কিন্তু আপনি নিজের অজান্তে আবারও বড়লোক হয়ে যাচ্ছেন? আপনি এখন আগের চেয়ে বেশি খরচ করবেন, পরিবহনমালিকদের আয় বাড়বে, এতে জিডিপিও কিন্তু বাড়বে। আর জিডিপির বৃদ্ধি মানেই তো মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি।

সরকারের নীতিই হচ্ছে যাদের আছে, তাদের আরও দাও। অর্থাৎ বড়লোক যত ধনী হবে, ততই উন্নয়ন চুইয়ে পড়বে ছোটলোকদের মধ্যে। বড় বড় প্রকল্প বানাও, এতে খরচ বাড়বে, জিডিপিও বাড়বে। বড়লোক আরও বড়লোক হবে। আর দুর্নীতির টাকা যদি দেশের মধ্যেই খরচ হয়, তাহলেও তো লাভ। সরকার এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা তহবিল দিয়েছে। এই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে খরচ না হলেও কিছু যায়–আসে না, কিছু লোকের হাতে তো অর্থ গেল। অর্থাৎ জিডিপি বাড়বে।

এবার বুঝলেন রাত পোহালেই নিজের অজান্তে রাতারাতি আপনি কীভাবে বড়লোক হচ্ছেন?

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন