বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লাভের লোভে ২০ লাখ

এম ডি ইকবাল হোসেন থাকেন বনশ্রীতে। পেশায় প্রকৌশলী ইকবাল ইভ্যালিতে পণ্য কিনতে গত এপ্রিলে ২০ লাখ টাকা দেন। চারটি মোটরসাইকেল, একটি ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ কয়েকটি পণ্যের জন্য তিনি এ টাকা দেন। ই-কমার্স খাত সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিপুল সম্ভাবনাময় হলেও ইভ্যালি বা ই-অরেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই তো খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তবু কেন বিনিয়োগ করলেন জানতে চাইলে এ গ্রাহক বলেন, বাজারমূল্যের চেয়ে ৩৫ শতাংশ কম দামে তিনি পণ্যগুলোর অফার পেয়েছিলেন। নিজে কিনে আরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারলে লাভ হতো। এর আগে তিনি কয়েক দফা পণ্য কেনাবেচা করে লাভ করেন, এতেই তার আস্থা তৈরি হয়েছিল। কয়েক দফা লাভবান হওয়ায় ভেবেছিলেন অন্যদের ক্ষেত্রে যা–ই ঘটুক, নিজের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আর তাতেই ভুল হয়েছে ইকবাল হোসেনের। আগে অল্পবিস্তর বিনিয়োগ করে পুলসিরাত পার হলেও লোভের আশায় গুঁড়েবালি হলো অধিক বিনিয়োগের সময়।

ইভ্যালি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই আলোচনা চলছে। উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ হয়ে সচেতন হলেন না কেন জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গত জুনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পণ্য বুঝে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইভ্যালি স্বাগত জানিয়েছিল। সে খবর তো সব গণমাধ্যমই ফলাও করে প্রচার করে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা নিয়ে সন্দেহ শুরুর পরও তো বিজ্ঞাপণের কমতি ছিল না। প্রভাবিত হব না কেন? এ গ্রাহক উল্টো প্রশ্ন করলেন লেনদেনের গেট কিপিং নিয়ে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও তাদের ঘাটতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক কি আগে থেকে কিছু জানত না? আমরা সচেতন, শিক্ষিত বিনিয়োগকারী হলেও নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চেয়ে বেশি জানা মানুষ নই। আর আগে কয়েক দফায় লাভবান হয়েছি, তাই বেশি বিনিয়োগে লোভ হবে, সেটাই তো খুবই স্বাভাবিক। অতীতের লেনদেনই আস্থা দিয়েছে বলে জানান ইভ্যালিতে ২০ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার ইকবাল হোসেন।’

শিক্ষিত সচেতন মানুষও যখন লোভের জন্য খতিয়ে না দেখে প্রভাবিত হওয়ার কথা বলে, তখন একটি কথাই বলার থাকে, মুনিনাঞ্চ মতিভ্রম (মুনি-ঋষিদের মতিভ্রম হলে সাধারণের তো হবেই)।

এর–ওর আছে, আমার নেই

হাজারো প্রতারিত গ্রাহকের মধ্যে যেমন শিক্ষিত সচেতন লোভে পড়া গ্রাহক আছে, তেমনি আছে মাকসুদুর রহমানের (ছদ্মনাম) মতো গ্রাহক। যিনি নিজেই কাজ করেন মুঠোফোনভিত্তিক অর্থ স্থানান্তরকারী দেশের প্রথম সারির এক এমএসএফ প্রতিষ্ঠানে। নানা রকম জালিয়াতির ঘটনার সমাধান তাঁর নিজের কাজের অংশ। সেই মাকসুদুর রহমান প্রতারিত হন ৩৯ শতাংশ লাভের টোপে। ২ লাখ ৩১ হাজার টাকার ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের বাজারমূল্য ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, অর্থাৎ প্রায় দেড় লাখ টাকা কম মূল্যে কেনার সুযোগ পেয়ে লোভ সামলাতে পারেননি। যে পণ্যের বাজারমূল্য থেকে অনলাইনে দাম এত কম, এতে সন্দেহ না হয়ে উল্টো লোভে পড়েন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কয়েকজন সহকর্মী ও বন্ধু লাভবান হয়েছেন। তখন থেকে মনে হয়েছে, ঝুঁকি না নিলে লাভের আশা নেই। নিজের চেয়ে কম বেতন পাওয়া দু–একজন তো রীতিমতো কমমূল্যে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে চাকরির মাসিক বেতনের চেয়ে বেশি টাকা পেয়েছেন। সেখানে তিনি একটি বাইক অর্ডার করেছিলেন নিজের জন্য। একই পণ্যের মূল্য দেড় লাখ টাকার ব্যবধান নিয়ে মনে প্রশ্ন আসেনি জানতে চাইলে বলেন, ‘অফিশিয়াল’ আর ‘ননঅফিশিয়াল’পণ্যের কথা। তিনি যেটি অর্ডার করেছিলেন সেটার যন্ত্রাংশ এনে সংযোজন করা হবে দেশে।

ব্যস্ত শহরের ঠাস বুনটের ভিড়ে আরও দ্রুত অফিসে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা ছিল মাকসুদুর রহমানের। সে ইচ্ছা উসকে দিয়েছিল ইভ্যালির বিশেষ অফার আর অমুক তমুকের দেখাদেখি ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। আদতে তা লাগামহীন লোভেরই প্রকারান্তর।

বৈধ লোভের বাহানায় বিনিয়োগ

ই-কমার্স খাতের বিনিয়োগ ছাড়াও যে আরও ফাঁদ আছে, তা শেয়ার বাজারের মাঝেমধ্যেকার ভয়াবহ দরপতনে কারও জানতে বাকি নেই। জুয়ার আসরকেও বা কেন সরিয়ে রাখা হবে! এক দশক ধরে নিয়মিত লেনদেন করেন আহম্মেদ ফিরোজ। তিনিও এমএসএফ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। সকালের আকাশ ছোঁয়া শেয়ার বিকেলে কেনা দামের অর্ধেক হয় বা ঠিক বিপরীত। এটা যে খুব সরল হিসাব না বুঝেও তো লোভের আশায় শেয়ার কিনছেন। ফিরোজ এ প্রশ্নের ধারেকাছে না ঘেঁষে বরং নিজের স্পষ্ট ব্যাখ্যায় শেয়ার বাজারের দরপতন ও ওঠানামাকে বৈধতা দিলেন এভাবে—শেয়ারবাজার আর ই-কমার্সের ফাঁদ এক কথা না। বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজার চলে এবং এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। শেয়ার মার্কেটে লগ্নিকারীরা রীতিমতো গবেষণা করে কেনাবেচা করেন। ফলে ই-কমার্স খাতের দু-একটা প্রতারিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার বাজারকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। এ যুক্তি দিয়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসাকে সাধারণ বিনিয়োগকারীর বৈধতা দেওয়ার মনোবৃত্তি। আর সে বাসনাগুলোই শেয়ারবাজারের প্রভাবশালীদের পুঁজি। এর বিশেষ দৃশ্য স্পষ্ট হয়েছিল ১৯৯৬ ও ২০১১ সালে। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই প্রথম আলোর একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘শেয়ারবাজারে ২৭ হাজার কোটি টাকা উধাও ১৫ দিনেই’। সূচকের লাগামহীন পতনে এক দিনে ৪ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছিল শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের। অনিয়ন্ত্রিত লোভ আরেক পক্ষের পুঁজি হলেও লাভের আশায় তাকে সহি করার বাসনাই লাগামহীন লোভের বৈধতা।

default-image

আহম্মেদ ফিরোজ ২০১১ সালে সাত লাখ টাকার বিনিয়োগের সবটাই খুইয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন। ঝুঁকি নিয়ে পুনরায় বিনিয়োগে লাভবান বলেই হয়তো তাঁর মনের জোর। তবে শেয়ার বাজারে সর্বস্বান্ত হয়ে ২০১৬ সালে ১২ লাখ টাকার ক্ষতি সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ৩৫ বছরের মহিউদ্দিন শাহারিয়ার। তাঁর ভগ্নিপতি আরিফুল ইসলাম জানান, সব জমি বিক্রি করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন মহিউদ্দিন। তার আগে ২০১২ সালে শেয়ারবাজারে দুই কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে আত্মহত্যা করেন চট্টগ্রামের দিলদার হোসেন। আরও অন্তত পাঁচজনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়, যাঁরা এই মাধ্যমে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন।

ইকবাল হোসেন, মাকসুদুর রহমান বা আহম্মেদ ফিরোজরা নিজের অজান্তে তলস্তয়ের গল্পের সেই পাহম হয়েছেন। এ প্রক্রিয়া এক দিনের নয়, এক দিনেই কেউ লোভী হয় না।

লোভ বাড়ে দ্রুত গতিতে

মানুষ তাঁর বাসযোগ্য ভূমিতে জীবনযাপনে নিজের দখল চায়। সে আকাঙ্ক্ষা তাকে প্ররোচিত করে আরও বেশি মুনাফা, অধিক বস্তু সংগ্রহে। অন্যদিকে তীব্র প্রতিযোগিতার জীবন আর চারপাশের তুলনা প্রতিদিন বারবার মুখোমুখি হয় পরাজয়ের। এ দ্বৈরথের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা ঠেলে দেয় কঠিন প্রতিযোগিতায়। বিজয়ের শত চৌকাঠ অতিক্রমের চেষ্টায় গোবেচারা সাধারণ মানুষও হয়ে উঠতে পারে একজন ‘পাহম’। তাই জমি বিক্রি করে সব টাকা শেয়ার বাজারে লগ্নি করার সাহস করতে পারেন মহিউদ্দিন। ২০ লাখ টাকা দিয়ে বসতে পারেন একজন প্রকৌশলী।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান জোবেদা খাতুন বলছিলেন মানুষের লোভী থেকে অতি লোভী হওয়ার নানা পর্বের কথা। তিনি বলেন, ‘এখন প্যারেন্টিংয়েই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আগে অভিভাবক, শিক্ষকেরা সন্তানদের জীবনের ঝুঁকির নানা দিক নিয়ে শেখাতেন। স্কুলে ধারণা দেওয়া হতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার। এখন সেসব শেখানো হয় না। সামাজিক অনুশাসনগুলো নষ্ট হচ্ছে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে। মানুষ সারাক্ষণই দৌড়াচ্ছে কিন্তু এ দৌড়ের পেছনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। একসময় সে বুঝতে পারছে যে ছুটতে ছুটতে নিজের জীবনটাকেই আর সে নিজের মতো পায়নি। এর ফলে ভেতরে তৈরি হচ্ছে শূন্যতা। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে সে ঝুঁকছে বস্তুগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিকে। সামাজিক অনুশাসনগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মানুষ আমরা থেকে শুধু আমি হয়ে গিয়েছে। আমরা মানে মানুষ তার চারপাশ, সমাজ ও পরিবার নিয়ে দায়বদ্ধতা অনুভব করত। এখন শুধুই নিজের অর্জন। এর পেছনে কাজ করে ছোটবেলা থেকে তাকে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা।’

আগে কয়েক দফায় লাভবান হয়েছি তাই বেশি বিনিয়োগে লোভ হবে সে তো খুবই স্বাভাবিক
একজন গ্রাহক

ইভ্যালি বা ই-অরেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা জেনেবুঝেও মানুষ লোভের স্কিমে পা কেন দেয় জানতে চাইলে জোবেদা খাতুন বলেন, পণ্যের প্রচারণা বাড়ানোর চেয়ে প্রয়োজন নৈতিকতার প্রচারণা বাড়ানো। যেসব মাধ্যম দিয়ে এ লেনদেন হয়, সেগুলো কি নজরদারির বাইরের? এ লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে শুরু করে গ্রাহকের নিজের চাহিদার সঙ্গে বোঝাপড়ার মনোবৃত্তি।

১৮৮৬ সালে প্রকাশিত লিও তলস্তয়ের গল্পের নাম ‘হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড রিকোয়ার’। বাংলা করলে হয়, একজন মানুষের কতটুকু জমি দরকার। নামকরণে ‘লোভ’ শব্দ ব্যবহার করতেই পারতেন লেখক। কিন্তু মানুষের লোভের মতো অবধারিত রিপুকে তিনি প্রশ্নের মুখে ছুড়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি। গল্পের নামে আছে লোভ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত। তলস্তয় যে পাহমের পরিণতি দেখিয়েছিলেন, সে পাহম প্রথমেই অতটা লোভী ছিল না, যতখানি হলে মুখে রক্ত ওঠে মৃত্যু হতে পারে। তখন তার একটু একটু করে জমি সংগ্রহের নেশা বরং পরিবারের কাছে আনন্দ হয়েই উঠেছে। পাহমকে যারা এক হাজার রুবলে অনির্দিষ্ট জমি দিতে চেয়েছিল তারা অতটাই বুদ্ধিমান, যতখানি হলে সহজেই জানা যায় মানুষের অধিক লোভই অসৎ ব্যবসায়ীর জন্য সবচেয়ে বড় পুঁজি।

বিশ্লেষণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন