স্মার্ট প্রযুক্তির হাত ধরেই বদলে যাবে দেশের কৃষি
দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সহজ অর্থায়ন ও আগামী দিনে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের নানা দিক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক।
প্রথম আলো: বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বর্তমান অবস্থা ও খাতের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
সুব্রত রঞ্জন দাস: বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশের বাস বাংলাদেশে, অথচ বিশ্বের আবাদযোগ্য জমির মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ রয়েছে আমাদের দেশে। তাই সীমিত জমিতে বেশি ফসল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। দেশে শস্যের নিবিড়তা ইতিমধ্যে অনেক বেশি; এটি আরও বাড়াতে এক ফসল কাটার পর দ্রুত পরবর্তী ফসলের আবাদ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বাড়ছে এবং চাষাবাদ ও ফসল কাটার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তীব্র শ্রমিকসংকট দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে সময়মতো কৃষিকাজ শেষ করতে যান্ত্রিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া কৃষকের গড় বয়স ৪৫ ছাড়ানোয় নতুন প্রজন্মের কৃষক তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ফসল কাটার পর ১০ থেকে ৪০ শতাংশ অপচয় হয়, যা রোধে কোল্ডস্টোরেজ প্রয়োজন। কৃষিজমির খণ্ডীকরণ, আধুনিক যন্ত্র সম্পর্কে সীমিত ধারণা এবং যন্ত্র কেনার উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয়ও বড় বাধা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রথম আলো: কৃষি যন্ত্রপাতির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে এসিআই মোটরস কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: এসিআই মোটরসের আধুনিক কারখানায় স্মার্ট পাওয়ার টিলার ও থ্রেশার তৈরি হচ্ছে। তবে ভারত বা চীনের মতো বড় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। তাই দেশীয় খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বেশি নজর দিতে হবে। বগুড়ায় যন্ত্রাংশ তৈরির বড় একটি শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, এখানে মান নিশ্চিত করতে উন্নত টেস্টিং ল্যাব স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথম আলো: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার সুযোগ কীভাবে বাড়ানো যায়?
সুব্রত রঞ্জন দাস: দেশে কৃষিজমি ছোট ও খণ্ডিত হওয়ায় সেবাদাতারা যন্ত্র কিনে কৃষকদের সেবা দেন। তাই কৃষকের পাশাপাশি এসব উদ্যোক্তার সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু দেশে বড় কেনাকাটা বা হায়ার পারচেজের জন্য স্বতন্ত্র ও যুগোপযোগী আইনি কাঠামোর অভাবে ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলত চেকভিত্তিক সুরক্ষা ও এনআই অ্যাক্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো আধুনিক হায়ার পারচেজ আইন প্রণয়ন করলে ক্রেতা ও অর্থায়নকারী উভয়ের সুরক্ষা বাড়বে। কিস্তিতে কৃষিযন্ত্র কেনার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে এমন আইন সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে এবং কৃষিযন্ত্রের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
প্রথম আলো: স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার, এআই ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারে এসিআই মোটরসের পরিকল্পনা কী এবং এ ক্ষেত্রে সমস্যা কী?
সুব্রত রঞ্জন দাস: কৃষিতে এআই, আইওটি ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। ইয়ানমার হারভেস্টারের সেন্সর ও জেএএক্সএর স্যাটেলাইট তথ্যের সঙ্গে এআই ও আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের ধান উৎপাদনের বাস্তবতার কাছাকাছি একটি মানচিত্র তৈরি করেছি। এই তথ্য সরকারকে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি এবং যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী। ধান উৎপাদনের পরিকল্পনা ও সম্পদের সঠিক বরাদ্দে এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সার ও কীটনাশক ছিটাতে ড্রোন ব্যবহারে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রথম আলো: মাঠে দ্রুত বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করতে এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে আপনারা কীভাবে কাজ করছেন?
সুব্রত রঞ্জন দাস: আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবায় সাড়া দেওয়া নিশ্চিত করি। যেমন ট্রাক্টরে মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে সার্ভিস প্রদান করা হয়। ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড, অ্যাপ ও আইভিআর কলের মাধ্যমে গ্রাহকসন্তুষ্টি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব প্রশিক্ষণ স্কুলে নিয়মিত মেকানিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রথম আলো: যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে সরকারের ভর্তুকি ও নীতিসহায়তার বিষয়ে আপনার প্রস্তাব কী?
সুব্রত রঞ্জন দাস: নতুন প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলায় কম্বাইন হারভেস্টার ও ট্রান্সপ্লান্টারে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রসারে প্রতিটি উপজেলায় কৃষি প্রকৌশলী নিয়োগ জরুরি। পাশাপাশি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট কৃষিযন্ত্রের ব্যবসায় ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতা, সুনাম এবং কার্যকর বিক্রয়োত্তর সেবা নেটওয়ার্ক থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরেজমিনে যাচাই করে এসব যোগ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানহীন যন্ত্র রোধে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং যান্ত্রিকীকরণের জন্য আলাদা একটি অধিদপ্তরও গঠন করতে পারে সরকার।
প্রথম আলো: আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে কৃষি খাতে কী পরিবর্তন দেখছেন এবং এসিআই মোটরসের ভূমিকা কী হবে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: বর্তমানে কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট পণ্যে আমাদের বার্ষিক আমদানি প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী ১০ বছরে তা দ্বিগুণ হতে পারে। আমাদের লক্ষ্য দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে এই আমদানিনির্ভরতা দূর করা। পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে সারের আমদানিও কমাতে চাই। আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিকে তরুণদের জন্য আকর্ষণীয় ও লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা নিজেদের খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের পাশাপাশি নেদারল্যান্ডসের মতো বিশ্ব কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখতে চাই। এই লক্ষ্য অর্জনে এসিআই মোটরস কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়।