আপনাদের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ছে। এটি কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?
এম শামসুল আরেফিন: বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত টেকসই অর্থায়ন সূচকের অন্যতম মানদণ্ড হলো পরিবেশবান্ধব ও টেকসই খাতে অর্থায়ন। পরিবেশবান্ধব অর্থায়নে এনসিসি ব্যাংক ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ২৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে টেকসই অর্থায়নে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৪৯৮ শতাংশ। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্য, প্রকল্প ও উদ্যোগে অর্থায়ন করেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, সমুদ্র অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ। এ ছাড়া আমরা বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন, জ্বালানিসাশ্রয়ী পরিবহন প্রকল্প, পাটপণ্য উৎপাদন প্রকল্পসহ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব ইটভাটা স্থাপনসহ আরও নানা খাতে ঋণ বিতরণ করেছি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা ভালো করেছি। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে টেকসই ব্যাংকিংয়ের প্রতি ব্যাংকের সবার অবিচল অঙ্গীকারের ফলে। পাশাপাশি পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো মূল ব্যবসায়িক কৌশলের সঙ্গে একীভূত করাও আমাদের এই অর্জনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। তবে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন করা ঋণের আদায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?
এম শামসুল আরেফিন: টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে দেওয়া ঋণের আদায় পরিস্থিতি সাধারণত প্রচলিত বা সাধারণ ঋণের চেয়ে তুলনামূলক ভালো হয়ে থাকে। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, এসব প্রকল্প ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রকল্পের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে স্বল্প সুদে পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা পাওয়া যায়, যা উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের বোঝা কমিয়ে দেয়। যা সময়মতো ঋণ পরিশোধে সহায়তা করে। তৃতীয়ত, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলো প্রায়ই নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনানির্ভর হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমায়। সেই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ায়। যা ঋণ আদায়ের হারকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সামগ্রিকভাবে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের খেলাপি ঋণের অনুপাত সাধারণ অর্থায়নের চেয়েও কম দেখা যায়।
”টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে দেওয়া ঋণের আদায় পরিস্থিতি সাধারণত প্রচলিত বা সাধারণ ঋণের চেয়ে তুলনামূলক ভালো হয়ে থাকে।
আপনাদের ব্যাংকের সেবার পরিধি দেশজুড়ে কতটুকু ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন? মানুষ কি সহজেই সেবা পাচ্ছেন?
এম শামসুল আরেফিন: বর্তমানে আমরা ১৩০টি শাখা ও ৯টি উপশাখার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। নিজস্ব ১৩৬টি এটিএম বুথের পাশাপাশি আমাদের গ্রাহকেরা দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ১৪ হাজারের বেশি এটিএম বুথ থেকে বিনা খরচে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। গ্রাহকসেবার আধুনিকায়নে আমরা বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিষেবা চালু করেছি। কার্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে গ্রিন পিন পরিষেবা বাস্তবায়ন করেছি। এনসিসি সঞ্চয়ী অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহকগণ কোনো কাগজের ব্যবহার ছাড়াই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন। আমাদের ফ্ল্যাগশিপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘এনসিসি আইকনের’ মাধ্যমে নির্বিঘ্নে করপোরেট গ্রাহকেরা অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন। পাশাপাশি আমাদের আছে রিটেইল ইন্টারনেট ব্যাংকিং পরিষেবা ‘এনসিসি অলওয়েজ’। এর মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে গ্রাহকেরা নিমেষেই নিজ ও অন্য ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর, মোবাইল রিচার্জ, মার্চেন্টের বিল পরিশোধ, কার্ডের বিল পরিশোধ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধসহ অনেক সেবা যেকোনো সময় ও স্থান থেকে গ্রহণ করতে পারছেন। গত বছর আমাদের ব্যাংকের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের মোট লেনদেনের প্রায় ৫৮ শতাংশই কাগজবিহীনভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে। এভাবেই এনসিসি ব্যাংক সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় আনা এবং তাঁদের কাছে ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আপনাদের এসব উদ্যোগ ব্যাংকিং সেবায় কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?
এম শামসুল আরেফিন: এনসিসি ব্যাংকের এ উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং সেবাকে দ্রুত, সহজতর ও নিরাপদ করে তুলছে, তেমনিভাবে পরিবেশ সংরক্ষণেও অবদান রাখছে। এর ফলে এনসিসি ব্যাংক একটি আধুনিক, দক্ষ ও পরিবেশ সচেতন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোগগুলো আমাদের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা আরও বৃদ্ধি করেছে। এটিএম থেকে রসিদ না দেওয়া ও বেশির ভাগ লেনদেন কাগজবিহীন সম্পন্ন হওয়ায় সরাসরি কাগজের ব্যবহার কমেছে। এটি গাছ কাটা রোধ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করছে।