দেশের করপোরেট খাতের প্রবৃদ্ধিতে ‘সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং’ এবং উদ্ভাবনী বাণিজ্য সেবায় মেঘনা ব্যাংক কীভাবে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: দেশের করপোরেট খাতের প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে মেঘনা ব্যাংক মূলত প্রথাগত অর্থায়ন থেকে সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন (সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স) ও পরিচালন মূলধনি সমাধানের (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সলিউশন) দিকে এগিয়েছে।
এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং। মেঘনা ব্যাংক এই বছর এ ধরনের অর্থায়ন শুরু করেছে। এরই মধ্যে কিছু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন শুরু করেছে।
মেঘনা ব্যাংকের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুততর সেবা দেওয়া নয়; বরং নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রাহকের আস্থাকে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা
প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মাধ্যমে গ্রাহকসেবাকে সহজ ও দ্রুত করার ক্ষেত্রে আপনাদের অর্জন কী কী?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক করার লক্ষ্যে মেঘনা ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ব্যাংকের তিনটি প্রধান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘মেঘনা ব্যাংক আই-ব্যাংকিং’ (ইন্টারনেট ব্যাংকিং), ‘মেঘনাপে’ (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) এবং ‘মেঘনা এডু’ (টিউশন ফি কালেকশন প্ল্যাটফর্ম) গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ও পেমেন্ট সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মেঘনা ব্যাংক শুধু প্রচলিত ব্যাংকিং সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করছে না; বরং গ্রাহকের দৈনন্দিন আর্থিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে আরও সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও সংযুক্ত ডিজিটাল ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
উদীয়মান এসএমই উদ্যোক্তা এবং ই-কমার্স বা গিগ ইকোনমির সঙ্গে যুক্ত তরুণদের ব্যাংকমুখী করতে কী কৌশল নিচ্ছেন?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: উদীয়মান উদ্যোক্তা ও তরুণদের ব্যাংকমুখী করতে তাঁদের ব্যবসার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন অর্থায়ন পদ্ধতি চালু করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টার্টআপ ঋণ ও নতুন উদ্যোক্তা পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচিতে আমরা অংশগ্রহণ করছি। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা চিহ্নিত ও অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশব্যাপী চলমান ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছি।
অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দ্রুত ও সহজে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে আমাদের নিজস্ব অনলাইন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল ন্যানো লোন’ পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা করছি। একই সঙ্গে ই-কমার্স ও অন্যান্য এসএমই ব্যবসার জন্য উদ্ভাবনী আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য অর্থায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সারদের প্রয়োজনভিত্তিক ব্যাংকিং সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন সুবিধার আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে স্বল্পব্যয়ের ঋণ দিচ্ছি।
বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ব্যাংকের ঋণের গুণগত মান ধরে রাখা এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী কী উপায় অবলম্বন করছেন?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং সঠিক খাতে ও সঠিক গ্রাহককে অর্থায়ন করে তাঁর ব্যবসাকে সচল রাখা।
মেঘনা ব্যাংক বিভিন্ন খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের মতো খাতে এখনো ভালো চাহিদা রয়েছে। তাই স্বল্প মেয়াদে আমরা এসব খাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
‘ক্যাশলেস পেমেন্ট’ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কিংবা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মেঘনা ব্যাংক কীভাবে কাজ করছে?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: ক্যাশলেস পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণে মেঘনা ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রাহক যেন একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন ডিজিটাল চ্যানেল ও পেমেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সহজে লেনদেন করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে ব্যাংক।
মেঘনা ব্যাংকের এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ‘মেঘনাপে’ বর্তমানে প্রধান পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটরদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যার ফলে সংযুক্ত পেমেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের ‘মেঘনাপে’ ওয়ালেট ব্যবহার করে ডিজিটাল পেমেন্ট করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সময় বৈশ্বিক সাইবার সুরক্ষার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে মেঘনা ব্যাংক কী ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ করেছে?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার সুরক্ষাকে মেঘনা ব্যাংক সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্রাহকের তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে শক্তিশালী অথেনটিকেশন, ডেটা সুরক্ষা, নিরাপদ এপিআই সম্পৃক্ততা এবং ট্রানজেকশন মনিটরিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আগামী পাঁচ বছরে একটি সম্পূর্ণ গতিশীল, প্রযুক্তিচালিত এবং টেকসই ব্যাংক হিসেবে মেঘনা ব্যাংকের মূল লক্ষ্য ও পরিকল্পনা কী?
সৈয়দ মিজানুর রহমান: মেঘনা ব্যাংকের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুততর সেবা দেওয়া নয়; বরং নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রাহকের আস্থাকে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাইবার সিকিউরিটি অবকাঠামো ও সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে উন্নত করার ওপর ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে। এভাবে ব্যাংক খাতে মেঘনা ব্যাংক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে চায়।