নির্বাচনে প্রার্থীদের বাড়ি-গাড়ি, স্বর্ণালংকারের দাম এত কম কেন

ছবি: এআই ব্যবহার করে তৈরি

এখন নির্বাচনের মৌসুম। প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে নিজেদের হলফনামা, ব্যক্তিগত নির্বাচনী খরচ ও সম্পদের বিবরণী, আয়কর রিটার্নের অনুলিপি জমা দিয়েছেন, যা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রার্থীদের আয়-ব্যয়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ যাবতীয় তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে।

হেভিওয়েট প্রার্থীদের আয়, সম্পদের মূল্য—এসব দেখে জনগণের মধ্যে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে প্রার্থীদের বাড়ি-গাড়ি, জমি, প্লট, সোনাদানা—এসব সম্পদের দাম এত কেন। যা তাঁদের (প্রার্থী) জীবনযাত্রার সঙ্গে মেলে না।

এর উত্তর হলো, প্রার্থীরা যে সম্পদ দেখিয়েছেন, তা অর্জনকালীন বা যখন কিনেছেন, তখনকার দাম দেখানো হয়েছে। আয়কর রিটার্নেও সেভাবেই অর্জনকালীন বা কেনা দাম দেখানো হয়।

একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, একজন করদাতা সত্তরের দশকে রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশানে একটি ১০ কাঠার প্লট কিনেছিলেন এক লাখ টাকায়। তিনি ওই প্লট বিক্রি করেননি। এখনো কর নথিতে এর দাম ১ লাখ টাকা আছে। বাস্তবে গুলশানে এখন ৫ কাঠার একটি প্লটের দাম ২৫-৩০ কোটির টাকা কম নয়।

মূলত আইনি প্রক্রিয়া মানতে গিয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীরা অর্জনকালীন বা কেনা মূল্য দেখান। তাই বাড়ি, গাড়ি, জমি, স্বর্ণালংকার, আসবাবসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির দাম এত কমে যায়। বাস্তবে তাঁদের সম্পদের মূল্য অনেক বেশি। তাঁরা কাগজে-কলমে যত ধনী, বাস্তবে আরও বেশি ধনী।

হলফনামা কী

নির্বাচনের হলফনামা হলো একজন প্রার্থীর দেওয়া লিখিত ঘোষণা, যা নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরমে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। এতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত, আর্থিক ও আইনি তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থী নিজেদের হলফনামায় নিজের সব ব্যক্তিগত তথ্য, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিবরণী দিয়েছেন। হলফনামার তথ্য ভুল দিলে প্রার্থিতা বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

হলফনামায় কী কী তথ্য দিতে হয়

হলফনামায় ব্যক্তিগত (যেমন নাম, বয়স, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা ইত্যাদি) দিতে হয়। এ ছাড়া নিজের ও স্ত্রী, সন্তানদের জমি, বাড়ি ইত্যাদি স্থাবর সম্পদ; নগদ টাকা, ব্যাংকে জমা টাকা, সোনা, কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানাসহ অস্থাবর সম্পদের তথ্য দিতে হবে।

সম্পদের মূল্য কত দেখাতে হয়

হলফনামায় প্রার্থীরা নিজেদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য দেখাতে হয়। ক্রয়কালীন বা অর্জনকালীন মূল্য ঘোষণা দিতে হয়। অর্থাৎ প্রার্থী যখন জমি-প্লট, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর সম্পদ কিনেছেন বা অর্জন করেছেন, তখন যে টাকায় কিনেছেন, এর মূল্য বলতে হয়। বর্তমান আনুমানিক মূল্যও দেন অনেকে।

একইভাবে সোনাদানা, আসবাব, ইলেকট্রনিকস পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের কেনা মূল্য ঘোষণা দিতে হয়। ফলে বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে তাই ব্যাপক ফারাক থাকে।

হলফনামার সম্পদের বিবরণীর একইভাবে আয়কর রিটার্নের সঙ্গেও মিল থাকতে হবে। প্রার্থীদের আয়কর রিটার্নের অনুলিপিও জমা দিতে হয়।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘করদাতাদের আইটি ১০বি ফরমের মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী দেন। সেখানে অর্জনকালীন বা কেনা মূল্যই দেখাতে হয়। এ দেশে সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয় না। এ ছাড়া জমি-ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য একেক জায়গায় একেক রকম। তাই সঠিকভাবে বর্তমান বাজারমূল্য ঠিক করা কঠিন।’

হলফনামায় ১০ ভরির সোনার দাম ১ লাখ টাকা, এখন কত

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবারের নির্বাচনে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী হবেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের হলফনামায় দেখিয়েছেন, তাঁর তিন একরের বেশি বা ৯ বিঘার বেশি অকৃষিজমি আছেন। এই জমির অর্জনকালীন মূল্য মাত্র ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এর মানে হলো, প্রতি বিঘা জমির দাম পড়েছে ৩৮ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বাস্তবে এত কম দামে এখন আর জমি মেলে না।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তাঁর হলফনামায় দেখিয়েছেন, ১১ দশমিক ৭৭ শতক জমির ওপর তাঁর ডুপ্লেক্স বাড়ি আছে। জমি, বাড়িসহ এর অর্জনকালীন মূল্য ২৭ লাখ টাকা। বর্তমানে এমন একটি বাড়ির দাম কোটি টাকার কম নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া শফিকুর রহমানের ১০ ভরি স্বর্ণালংকার আছে। এই ১০ ভরি স্বর্ণালংকারের অধিগ্রহণকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ টাকা। প্রতি ভরির দাম গড়ে ১০ হাজার টাকা, যা অন্তত দুই দশক আগের দাম। অথচ বর্তমানে এক ভরি সোনার দাম দুই লাখ টাকার বেশি। সেই হিসাবে ১০ ভরি স্বর্ণালংকারের বর্তমান বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকার বেশি।

গুলশানে ফ্ল্যাটের দাম ২০ লাখ টাকা কেন

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি তাঁর হলফনামায় পাঁচ একর কৃষিজমি দেখিয়েছেন। পাশাপাশি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দোতলা বাড়ির একাংশের মালিক। সব মিলিয়ে তাঁর স্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য মাত্র ১৯ লাখ ৫ হাজার টাকা। বাস্তবে এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য অনেক বেশি।

এদিকে মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরার নামে থাকা গুলশান-২–এ ১ হাজার ৯৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের অর্জনকালীন দাম দেখানো হয়েছে ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাস্তবে গুলশান-২ এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের বর্তমান দাম কয়েক কোটি টাকার কম নয়। এ ছাড়া রাহাত আরার নামে পূর্বাচলে ৫ কাঠার প্লটের কেনা দাম ৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। অথচ এখন পূর্বাচলে প্রতি কাঠার দাম অন্তত এক কোটি টাকা।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেনের রংপুরের কাউনিয়ায় ১৮ শতাংশ জমি আছে। হলফনামায় এর অর্জনকালীন মূল্য দেখান ২৩ হাজার টাকা। ১ শতাংশ জমির দাম পড়ে ১ হাজার ২৭৮ টাকা। বর্তমানে ওই এলাকায় জমির দাম আরও অনেক বেশি।

বাড়ি-গাড়ি, প্লট-জমি, স্বর্ণালংকারসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কেনা মূল্য বা অর্জনকালীন মূল্য অনেক কম থাকে। কিন্তু বর্তমান বাজারদর অনেক বেশি। নির্বাচনের হলফনামায় কেনা মূল্য বা অর্জনকালীন মূল্য দেখানোর ফলে প্রার্থীদের প্রকৃত সম্পদমূল্য উঠে আসে না। ফলে প্রার্থীদের সম্পদের দাম কত বা তাঁরা কত ধনী, তা সম্পর্কে ভোটার তথা জনগণ জানতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘হলফনামায় সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়। কিন্তু নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া সম্পদ, আয়-ব্যয়ের তথ্য নিয়ে জনগণের আস্থা ছিল না। যে হিসাব দেওয়া হয়, তা কতটা বাস্তবসম্মত-তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বেনামে সম্পদ বা আয় আছে কি না, তা দেখা উচিত। তাদের জীবনযাত্রা কেমন-তা বিবেচনায় আনা যেতে পারে।’

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করতে পারে। সঠিক তথ্য দেওয়া না হলে কিছু দৃষ্টান্ত হিসেবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে এই প্রবণতা কমে আসবে।