অটোমোবাইল

অটোমোটিভ বাজারের মোড় ঘোরাতে চায় বিওয়াইডি

বাংলাদেশের অটোমোটিভ বাজারে এখন এক বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিনের জ্বালানিচালিত রিকন্ডিশন গাড়ির আধিপত্য ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে নিউ এনার্জি ভেহিকেল (এনইভি)। এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে বিশ্বের এক নম্বর এনইভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি। বাংলাদেশে বিওয়াইডির অগ্রযাত্রা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাজার তৈরির চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন বিওয়াইডি বাংলাদেশের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ইমতিয়াজ নওশের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে আপনাদের এই যাত্রার শুরুটা কেমন ছিল? দেশের মানুষের কাছে ব্র্যান্ডটি কীভাবে পরিচিতি পাচ্ছে?

ইমতিয়াজ নওশের: আমরা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করি এবং মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসি। শুরুতে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘এনইভি’ (নিউ এনার্জি ভেহিকেল) সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দেওয়া। অনেকে ইভি বুঝলেও এনইভি কী, তা জানতেন না। এ ছাড়া চীনা পণ্যের প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণা ছিল, যা কাটানো আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। আমরা মূলত দুটি কাজ করেছি—ক্যাটাগরি বিল্ড করা এবং ব্র্যান্ড নলেজ দেওয়া। আমাদের সিল এবং অ্যাটো ৩ মডেলের মাধ্যমে আমরা প্রথম বড় সাফল্য পাই।

প্রথম আলো:

আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য আপনাদের লক্ষ্য কী?

ইমতিয়াজ নওশের: আমরা বিওয়াইডিকে বাংলাদেশের অটোমোটিভ বাজারের শীর্ষস্থানে দেখতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, এই সময়ের মধ্যে মানুষের আগ্রহ হাইব্রিড এবং ইভির দিকে আমূল বদলে যাবে। বিওয়াইডি নিজেই সব যন্ত্রাংশ তৈরি করে বলে আমরা প্রতিযোগীদের চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের পণ্য দিতে পারি। ২০২৬ সাল আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হবে, যখন আমরা সব শ্রেণির গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারব।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে তো রিকন্ডিশন এবং জাপানি গাড়ির আধিপত্য দীর্ঘদিনের। এই জায়গা দখল করা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

ইমতিয়াজ নওশের: চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে, তবে ইতিবাচক দিক হলো, মানুষ এখন অনেক সচেতন। ইন্টারনেটের কারণে তাঁরা সহজেই তথ্য যাচাই করতে পারছেন। আমাদের শোরুমের ফুটফল এবং টেস্ট ড্রাইভের সংখ্যা প্রতি মাসেই বাড়ছে। আমরা টয়োটা এলিয়ন, প্রিমিও বা অ্যাক্সিওর মতো জনপ্রিয় সেগমেন্ট এবং এন্ট্রি লেভেল এসইউভি বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছি।

প্রথম আলো:

একজন ক্রেতা কেন নিয়মিত জ্বালানিচালিত গাড়ির বদলে ইভি বা বিওয়াইডি বেছে নেবেন? আর্থিক সাশ্রয় কেমন হবে?

ইমতিয়াজ নওশের: প্রধান কারণ হলো খরচ এবং প্রযুক্তি। একটি সাধারণ আইসিই গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ১৫-১৭ টাকা, সেখানে আমাদের অ্যাটো ৩-এ খরচ মাত্র ২.১৫ টাকা। এ ছাড়া আমরা আট বছরের ব্যাটারি রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি দিচ্ছি, যা কোনো সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়িতে পাওয়া সম্ভব নয়। বিওয়াইডির ‘ব্লেড ব্যাটারি’ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাটারি হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের প্যাটেন্টের সংখ্যা এখন ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে আমরা প্রযুক্তিতে কতটা এগিয়ে।

প্রথম আলো:

চার্জিং অবকাঠামো নিয়ে গ্রাহকদের মনে একধরনের ভয় কাজ করে। এটি কাটাতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

ইমতিয়াজ নওশের: চার্জিংয়ের সমস্যাটি আসলে অনেকটাই মানসিক। আমাদের গাড়িগুলো এক চার্জে ৪০০ থেকে ৫৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে। সাধারণত কেউ সপ্তাহে ৪০০ কিলোমিটার গাড়ি চালায় না। আমরা প্রতিটি গাড়ির সঙ্গে ফ্রি হোম চার্জার দিচ্ছি। এ ছাড়া দেশজুড়ে চার্জিং নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ চলছে। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রধান সড়কগুলো চার্জিং সুবিধার আওতায় আসবে। এমনকি বিশেষ প্রয়োজনে যেকোনো থ্রি-পিন সকেট দিয়েও বিওয়াইডি গাড়ি চার্জ করা সম্ভব।

প্রথম আলো:

পুনঃ বিক্রয়মূল্য নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিওয়াইডির অবস্থান কী?

ইমতিয়াজ নওশের: রাস্তায় যে গাড়ির সংখ্যা যত বাড়বে, ওই গাড়ির পুনঃ বিক্রয়মূল্য তত বাড়বে। আমরা প্রথম বছরেই ৫০০-এর বেশি গাড়ি বিক্রি করেছি, যা এই বাজারে একটি রেকর্ড। বিওয়াইডির গাড়ির চাহিদা এখনই এত বেশি যে অনেক সময় বর্তমান মালিকেরা বিক্রি করার আগে থেকেই ক্রেতা পেয়ে যাচ্ছেন। একটি ব্র্যান্ডনিউ গাড়ি সাধারণত মানুষ চার বছর ব্যবহার করেন, তাই রিসেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

প্রথম আলো:

তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কি?

ইমতিয়াজ নওশের: আমরা অনেক বেশি ডিজিটালনির্ভর কাজ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ইউথ অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম’ চালু করেছি। এ ছাড়া আমরা চালক এবং স্থানীয় টেকনিশিয়ানদেরও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। সম্প্রতি আমরা একটি ক্রস-কান্ট্রি ড্রাইভ করেছি, যেখানে আমাদের প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িটি এক চার্জ এবং এক ফুল ট্যাংকে ১২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। আমরা চাই মানুষ কেবল তথ্য না জেনে সরাসরি গাড়ি চালিয়ে দেখুন। আমাদের বিশ্বাস, একবার কেউ বিওয়াইডি চালালে তিনি এর প্রযুক্তির প্রেমে পড়বেনই।

প্রথম আলো:

বিওয়াইডি গাড়ির বিশেষ টেকনোলজি বা ড্রাইভিং অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?

ইমতিয়াজ নওশের: আমি ব্যক্তিগতভাবে বিওয়াইডির ‘আই-ট্যাক’ ফিচারটির কথা বলব। আমি দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছি এবং হাইস্পিড ড্রাইভিং বা বাঁক নেওয়ার সময় গাড়ির কন্ট্রোল নিয়ে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। সাধারণত সামনের চাকার ড্রাইভের গাড়িগুলো যখন ১৩০-১৪০ কিলোমিটার গতিতে টার্ন নেয়, তখন গাড়ির পেছনের অংশ ট্র্যাকের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু বিওয়াইডির ইন্টেলিজেন্ট টর্ক অ্যাডাপ্টেশন কন্ট্রোল বা আই-ট্যাক সিস্টেমটি এতই উন্নত যে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাস্তার অবস্থা বুঝে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এমনকি হাইস্পিডেও চালক অনুভব করবেন যে গাড়িটি মাটির সঙ্গে কামড়ে লেগে আছে। এটি মূলত রেসিং কারের ফিচার, যা বিওয়াইডির অ্যাটো-৩–এর মতো ভারী গাড়িতেও অসাধারণ স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে তো এখনো অনেক মানুষ চীনা প্রযুক্তির গাড়ি নিতে দ্বিধাবোধ করেন, তাঁদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

ইমতিয়াজ নওশের: দেখুন, বিশ্ব এখন বদলে গেছে। বিওয়াইডি এখন বিশ্বের এক নম্বর নিউ এনার্জি ভেহিকেল নির্মাতা। অ্যাপল বা টেসলার মতো বড় বড় কোম্পানিও তাদের ব্যাটারি বা যন্ত্রাংশের জন্য অনেক ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। আমরা বাংলাদেশে শুধু গাড়ি বিক্রি করছি না, আমরা একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরি করছি। যাঁরা দ্বিধায় আছেন, আমি তাঁদের বলব, আমাদের কোনো একটি শোরুমে এসে একবার গাড়িটি চালিয়ে দেখুন। বিওয়াইডি একটি ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড কোম্পানি, অর্থাৎ ব্যাটারি থেকে শুরু করে চিপ পর্যন্ত আমরা নিজেরাই তৈরি করি। এই গুণগত মান এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষ একবার পরখ করলেই আপনার দীর্ঘদিনের ধারণা বদলে যাবে। আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলছি, এটি কেবল একটি গাড়ি নয়, এটি ভবিষ্যতের একটি স্মার্ট ডিভাইস।