সাক্ষাৎকার

বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই

দেশের নির্মাণ ও শিল্প খাতে আকিজবশির গ্রুপে আস্থা ও গুণগত মানের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ধারায় এবার যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক কেব্‌লস। দেশের অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার বড় একটি অংশই ঘটে নিম্নমানের কেবলের কারণে। এই বাস্তবতায় দেশের বৈদ্যুতিক কেব্‌লসের বাজারে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে গ্রুপটি। নতুন বিনিয়োগ, বাজারকৌশল, পণ্যের বিশেষত্ব ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন আকিজবশির গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ

প্রথম আলো:

দেশে ইতিমধ্যে ছোট-বড় অনেক কেব্‌লস কোম্পানি সক্রিয়। এই বাজারে আকিজবশির গ্রুপের নতুন করে বিনিয়োগের বিশেষ কারণ কী?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: আমাদের গ্রুপের ব্যবসার প্রায় ৬০ শতাংশ পণ্য হচ্ছে নির্মাণসামগ্রীর। বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস বিভাগের সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ হিসেবে উচ্চমানের বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছি। আমরা দেখেছি, বাজারে সরবরাহ আছে ঠিকই, কিন্তু মান ও নিয়মিত সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষও কম নয়। অনেক পরিবেশক ও গ্রাহক নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের পণ্য সময়মতো পান না। এই জায়গাটিতেই আমরা সুযোগ দেখেছি। আকিজবশির কেব্‌লস মানসম্মত ব্র্যান্ডের পণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে চায়। উৎপাদন উপযোগী একটি আধুনিক কারখানা পাওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে। কৌশলগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ধীরে ধীরে এই খাতের প্রয়োজনীয় সব পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করব। তার বিপণনের মাধ্যমে দেশের সব প্রান্তের গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আমরা বৈদ্যুতিক পাখা ও লাইট বাজারে আনব।

প্রথম আলো:

একজন সাধারণ ভোক্তা বা বড় প্রকল্পের ক্রেতা কেন অন্যান্য ব্র্যান্ড বাদ দিয়ে আকিজবশির কেব্‌লস বেছে নেবেন—অন্যদের চেয়ে আপনাদের পণ্যের মূল পার্থক্য কোথায়?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: অন্যদের সঙ্গে আমাদের প্রধান পার্থক্য গুণগত মান ও নিরাপত্তা। আকিজবশির কেব্‌লসে থ্রি-লেয়ার ইনসুলেশন ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাজারে খুব কম দেখা যায়। এই অতিরিক্ত স্তর তারের স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। আমাদের কেব্‌লস ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহনশীল। যেখানে সাধারণ কেব্‌লস ৭০ বা ৯০ ডিগ্রির বেশি নিতে পারে না। এই উচ্চ তাপ সহনশীলতা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। আমরা যে মানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তা বাস্তব উৎপাদন ও পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হচ্ছে।

আমরা ধীরে ধীরে এই খাতের প্রয়োজনীয় সব পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করব। তার বিপণনের মাধ্যমে দেশের সব প্রান্তের গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আমরা বৈদ্যুতিক পাখা ও লাইট বাজারে আনব।
প্রথম আলো:

প্রাথমিকভাবে আপনারা কোন কোন ধরনের বৈদ্যুতিক কেব্‌লস বাজারে আনছেন? গৃহস্থালি, শিল্প, অবকাঠামো বা বিদ্যুৎ খাত—কোন খাতকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: প্রাথমিকভাবে শিল্প ও আবাসন খাতের জন্য বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনে জোর দিচ্ছি। হাউস ওয়্যারিং কেব্‌ল, লো–ভোল্টেজ কেব্‌লসহ নির্মাণ খাতে বহুল ব্যবহৃত পণ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আছে এলএফ, এফআর, এফআরএলএস, এলএসজেডএইচ এবং ফায়ার সারভাইভেবল কেব্‌লস। এ ছাড়া লো-ভোল্টেজ ও মিডিয়াম ভোল্টেজের (৩৩ কেভি পর্যন্ত) আর্মার্ড ও নন-আর্মার্ড, টেলিকমিউনিকেশন, সোলার কেব্‌লস ও ডেটা কেব্‌লস এবং ওভারহেড কন্ডাক্টরও আছে। ধাপে ধাপে অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় আরও পণ্য যুক্ত হবে।

প্রথম আলো:

বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড রোধে আকিজবশির কেব্‌লসের বিশেষত্ব কী?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: অগ্নিদুর্ঘটনার মূল কারণ বেশির ভাগ সময় নিম্নমানের কাঁচামাল। আমরা এই জায়গায় কোনো আপস করছি না। আকিজবশির কেব্‌লসে স্ক্র্যাপ ব্যবহার করা হয় না। ৯৯ দশমিক ৯৯৮ শতাংশ খাঁটি তামা এবং উন্নত মানের ইনসুলেশন ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হচ্ছে। কাঁচামাল সংগ্রহেও আমরা নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক উৎসের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব কারণে আমাদের কেব্‌লস বৈদ্যুতিক ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

প্রথম আলো:

বাজারে নিম্নমানের ও অবৈধ কেব্‌ল এখনো বড় সমস্যা। এটি আপনাদের ব্যবসা ও এই শিল্পকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: এটি পুরো শিল্পের জন্যই বড় সমস্যা। নকল ও নিম্নমানের পণ্য শুধু ভালো ব্র্যান্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং ভোক্তার নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে। এটি প্রতিরোধে প্রত্যেক অংশীজনের সম্পৃক্ততা দরকার। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির যেমন দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদেরও দায়বদ্ধতা আছে। পাশাপাশি ক্রেতাদের সচেতন হতে হবে। সরকারি সংস্থা বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। কারও একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তার উৎপাদনের সক্ষমতা সবার নেই। চাইলেই যে কেউ বানিয়ে ফেলতে পারে না। ফলে নকল তার উৎপাদন বন্ধ করা কঠিন কিছু নয়।

প্রথম আলো:

উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে? এই ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ কী?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: আমাদের কারখানায় জার্মানি ও চীনের আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে। আমাদের পণ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মান বজায় রাখা আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এই ব্যবসার প্রথম চ্যালেঞ্জ আমদানিনির্ভর কাঁচামাল। ভালো মানের কাঁচামাল পেতে লন্ডল ম্যাটালের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তা ছাড়া বাজারে নকল ব্র্যান্ড আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। নকল পণ্যের বাজারজাত বন্ধ না হলে ভালো ব্র্যান্ডের কোম্পানিগুলো উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে।

প্রথম আলো:

বর্তমানে আপনাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা কত এবং ভবিষ্যতে কতটা উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: বর্তমানে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টন তামার তার এবং ২ হাজার ৫০০ টন অ্যালুমিনিয়ামের কেব্‌লস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে আমাদের। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা আছে। পাশাপাশি বাজারে আকিজবশির কেব্‌লসকে একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

প্রথম আলো:

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ও ডলার–সংকটের মধ্যে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কেব্‌লস শিল্পে বড় বিনিয়োগ কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে। কয়েক মাস ধরে ডলারের বাজার অনেকটা স্থিতিশীল আছে। এটার ওপর ভিত্তি করেই আমরা বিনিয়োগে এসেছি। দেশের আবাসনের বাজার ধীরে হলেও ভালো হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর আবাসন খাতে ব্যবসা বাড়বে। এই খাতে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবৃদ্ধি হবে। এ কারণে ব্যবসা অনেকটা ভালো হবে বলে আশা করছি। আকস্মিক কিছু হলে যেমন কোভিড বা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বা বৈশ্বিক কোনো চ্যালেঞ্জ হলে তা ভিন্ন বিষয়। তা ছাড়া ছোটখাটো কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে, তা উতরে যাওয়া সম্ভব হবে।

প্রথম আলো:

রপ্তানির কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: আপাতত দেশের চাহিদা পূরণই আমাদের মূল লক্ষ্য। তবে ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে রপ্তানির সুযোগ দেখছি।

প্রথম আলো:

সামগ্রিকভাবে আগামী পাঁচ বছরে দেশের কেব্‌ল শিল্পের সম্ভাবনা আপনি কেমন দেখছেন? আকিজবশির কেবলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম: বর্তমানে দেশে বৈদ্যুতিক তারের বাজার ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার। আগামী পাঁচ বছরে এই বাজার ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হবে। তখন আকিজবশির তারের বাজারে হাজার কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করতে পারবে। বর্তমানে ১২ ধরনের তার তৈরি হচ্ছে। কেব্‌লস দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ভবিষ্যতে আমরা বৈদ্যুতিক পাখা, লাইট, সুইচ-সকেট এমনকি হাই-ভোল্টেজ (১৬২ কেভি পর্যন্ত), মেরিন কেব্‌লস ও অপটিক্যাল ফাইবার বাজারে আনব। গ্রাহকের নিরাপত্তা ও আস্থাই আমাদের মূল শক্তি।