বাজেট বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ

আহসান এইচ মনসুরফাইল ছবি

যেকোনো রাজনৈতিক সরকারের উচ্চাভিলাষী আকাঙ্ক্ষা থাকে। সেই আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন দেখেছি আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে ঘোষিত এই বাজেট মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্থমন্ত্রী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এক বাজেট দিয়েছেন। মূলত টাকা ঢেলে চাহিদা বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের উদ্যোগ রয়েছে এবারের বাজেটে। টাকা দিয়ে অর্থনীতিতে কিছুটা গতি সঞ্চার করা যায়, এটা ঠিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই টাকাটা কোথা থেকে আসবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আদায় করতে হবে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিমাণ রাজস্ব আদায় আদৌ হবে কি না। আমার ধারণা হবে না। আর রাজস্ব আদায় যত কম হবে, বাজেটঘাটতির পরিমাণও তত বাড়তে থাকবে। তখন বাজেটে সরকার যেসব পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? সে ক্ষেত্রে দুটো পথ খোলা থাকবে সরকারের সামনে। তার একটি টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বাজেটে ঘোষিত সরকারের ব্যয় কমাতে হবে। যদি টাকা ছাপানো হয়, তাহলে আর্থিক খাতের বেশির ভাগ অর্থ সরকারের কাছে চলে যাবে। আর টাকা ছাপালে অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতিতে তার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমাদের যে অর্থনীতি তাতে সরকারের অবদান ১৪ শতাংশ। আর বেসরকারি খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ। এই অবস্থায় আর্থিক খাতের সিংহভাগ অর্থ যদি সরকারই নিয়ে নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত টাকা পাবে কোথায়? আর বেসরকারি খাত যদি টাকা না পায়, তাহলে অর্থনীতি কীভাবে গতিশীল হবে। এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না আমি। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে, এই সময়ে যেখানে সরকারের বাস্তবতা মেনে ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি ছিল, তখন সরকার চাহিদা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করার পথ বেছে নিয়েছে। এই পথ বড়ই কঠিন। সরকার যে পথ বেছে নিয়েছে তাতে সংকট আরও বাড়বে বলেই আমার ধারণা।

এবারের বাজেটে ব্যবসা সহজ করার অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমলাতন্ত্র যেন এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
আহসান এইচ মনসুর, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

বাজেটে বিদেশ থেকে ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিও অর্জিত হবে না। তাহলে সেখানেও ঘাটতি বাড়বে। সেই চাপ এসে পড়বে অভ্যন্তরীণ খাতে। তাই এই বাজেট বাস্তবায়নে আমি বহুমুখী চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি। এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সম্প্রতি আমরা দেখলাম দেশের বেসরকারি একটি শিল্পগোষ্ঠীকে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। বাজেটের যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাতে আমি মনে করি দেশের বেসরকারি খাতকে বহির্মুখী করা ভালো। দেশের বেসরকারি খাতের যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চায় বা যোগ্যতা রাখে, তাদের উৎসাহিত করা ভালো। তাতে দেশের আর্থিক খাতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে।

বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনলে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এটিকে আমি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নজর রাখতে হবে এই বিনিয়োগ যেন রাউন্ড ট্রিপে পরিণত না হয়। অর্থাৎ প্রণোদনা নেওয়ার জন্য বিনিয়োগ এনে আবার তা যেন বিদেশ চলে না যায়। প্রণোদনার আওতায় আসা বিনিয়োগ যাতে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। বাজেটের আরেকটি বিষয় আমার ভালো লেগেছে, সেটি হলো সরকারের সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক তারা দেশের গরিব মানুষের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। পরিবার বা ফ্যামিলি কার্ড সরকারের সেই আচরণেরই প্রতিফলন। আমি মনে করি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় যত ধরনের কর্মসূচি রয়েছে সবগুলোকে সেন্ট্রাল ডেটাবেজের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করলে তার ভালো সুফল পাওয়া যাবে।

সরকারের বিশাল বাজেটের বড় অনিশ্চয়তা ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। ব্যাংক খাত থেকে সরকার বেশি ঋণ করলে এই অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। এমনিতে ব্যাংক খাত খুব নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। তার মধ্যে আমরা দেখছি ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে আবার সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে পুরো ব্যাংক খাতের আমানত প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার যে উদ্যোগ, সেটিকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আমার সময়কালে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটিরও নিষ্পত্তি করা দরকার। আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কারণ, আর্থিক খাতের সমস্যা দূর না হলে বাজেটের অর্থায়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আমরা বড় ধরনের ঘাটতি বাজেট দেখতে পাই। কিন্তু দেশটির ব্যাংক ও আর্থিক খাত অনেক শক্তিশালী ও গভীর হওয়ায় ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়নে দেশটিকে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। কিন্তু আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক খাত অত্যন্ত দুর্বল ও অগভীর। এ রকম একটি অগভীর ও দুর্বল আর্থিক খাত নিয়ে এত বড় ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন।

আর্থিক খাতের পাশাপাশি আমাদের রাজস্ব খাতও খুব দুর্বল ও অদক্ষ। এনবিআরের সংস্কার এখন বাধ্যতামূলক অবস্থায় চলে গেছে। অদক্ষতা ও দুর্নীতি রাজস্ব আয়ের পথে বড় বাধা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এনবিআর দুই ভাগ করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, সেটি আবারও নতুন করে শুরু করা দরকার। এ ছাড়া উচ্চ করহারও রাজস্ব আদায়ের পথে বড় বাধা। যত বেশি কর, তত বেশি ফাঁকি—এটি মনে রাখা দরকার। সংস্কারের মাধ্যমে পরোক্ষ কর কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে আমি মনে করি, ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এবারের বাজেটে ব্যবসা সহজ করার অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমলাতন্ত্র যেন এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী রেখে ব্যবসায়ীর ক্ষতি করে কোনো লাভ হবে না। বরং সরকারের দিক থেকে বেসরকারি খাতে ও ব্যবসার ক্ষেত্রে অযাত্রিত হস্তক্ষেপ যত বেশি কমানো যাবে, ততই বেসরকারি খাত এগিয়ে যাবে। তাতে অর্থনীতিই লাভবান হবে। সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও বিধিবিধান বেসরকারি খাতকে বেআইনি কর্মকাণ্ডে বেশি উৎসাহিত করে।