স্বস্তির চুক্তি, নাকি ভবিষ্যতের বোঝা: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতার অর্থনীতি

সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেমপ্রথম আলো ফাইল ছবি

শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হলো। আমাদের শুল্ক কিছুটা কমেছে, এতে হয়তো অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করছেন। কিন্তু এই চুক্তি করার জন্য যেসব অঙ্গীকার আমাদের করতে হয়েছে, তার জন্য কী ধরনের চাপ আমাদের মোকাবিলা করতে হবে, তা নিয়ে আমার উদ্বেগ। সেই সঙ্গে চুক্তির সব বিষয় আমরা এখনো জানি না।

দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অশুল্ক বাধা কমানোর কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের হিস্যা বাড়াতে গেলে এর বিকল্প নেই, কিন্তু এই অশুল্ক বাধার বিষয়টি যেন শুধু এক দেশের জন্য প্রযোজ্য না হয়, সব দেশের জন্যই যেন প্রযোজ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই চুক্তিগুলো দ্বিপক্ষীয় প্রকৃতির। অর্থাৎ এত দিন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীনে যে নিয়মতান্ত্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ছিল, তা থেকে সরে আসা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই সেটা হচ্ছে তা সবাই জানেন। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে আমাদের অনেক কিছু মেনে নিতে হচ্ছে।

সমস্যা হলো, এখন অন্যান্য দেশও যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো চাপ দিয়ে আমাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে চায়, তখন কী হবে। এই বিষয়টি আমাদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে।

বিভিন্ন দেশ যেন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেমেছে, কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কত বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায়। বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে এই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া খুব সুখকর কিছু নয়। এমনিতেই আমরা ভারসাম্যহীন অবস্থায় আছি। তারপর সামনে এলডিসি উত্তরণের বিষয় আছে। মনে রাখা দরকার, বিশ্ব বাণিজ্যে, বিশেষ করে, রপ্তানিতে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর হিস্যা গত ২০ থেকে ৩০ বছরে কমেছে। এখন তা এক শতাংশের মতো। সে জন্য তাদের অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়া হয়, কিন্তু এ ধরণের ভারসাম্যহীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির ব্যবস্থায় সেগুলো থাকছে না। এখন আমাদের মতো দেশকেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক কিছু কিনতে হবে।

পাল্টা শুল্ক কমানোর বিপরীতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান কিনব। কিন্তু এই বোয়িং কেনার বিষয়টি আমাদের সামগ্রিক বিমান পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং তা কতটা বিবেচনা বিবেচনা করা হয়েছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

মূল সমস্যাটা এখানেই। ভারতের মতো বৃহৎ দেশের সঙ্গে যখন আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হয়, তখন আমাদের বিপন্ন বোধ করা ছাড়া উপায় থাকে না। ভারতের হাতে অনেক বিকল্প আছে। তারা ভেনেজুয়েলার তেল কিনবে বা নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বাজার সুবিধা দেবে। তাদের বড় মধ্যবিত্ত শ্রেণি আছে। ফলে তারা এই সুবিধা দিতেই পারে। কিন্তু আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। ভারত যেভাবে দর-কষাকষি করতে পারে, আমরা সেভাবে পারি না।

যা হোক, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ। এখন এই চুক্তির ভার বহন করতে হবে পরবর্তী সরকারকে। বিষয়টি তাদের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হবে। এমনিতেই আমাদের জাতীয় ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। এখন বোয়িং কেনার জন্য আমাদের যদি আরও ঋণ নিতে হয় এবং তার বাণিজ্যিক সুবিধা আমরা নিতে না পারি, তাহলে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এসব হিসাব-নিকাশ করার বিষয় আছে।

আরেকটি বিষয় হলো, এসব চুক্তির স্থায়ীত্ব কতটা। এখন পরবর্তী নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে কি এই চুক্তি থাকবে নাকি নতুন সরকার তা পুনর্বিবেচনা করবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা থেকে যায়। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে।

সেলিম রায়হান: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, সানেম।