কম হারের ভ্যাট থেকে বেশি আদায়, একক ভ্যাট হারের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু

বাংলাদেশে ভ্যাট সংস্কার নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। বেশ কাজও হয়েছে। তবে শেষ ফলাফল হলো আমাদের দেশে কর-জিডিপি হার এখনো পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এতে প্রমাণিত হয় যে সংস্কারকাজগুলো সঠিক ছিল না।

৩০ বছর বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় কাজ করে আমি যা বুঝেছি, তা হলো কম গুরুত্বপূর্ণ কথা বেশি বলা হয়, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করা হয়। তা আবার ভালোভাবে আগায় না বা ভালোভাবে শেষ হয় না। আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় যে পদক্ষেপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে তেমন কথা নেই, কাজও নেই। এর কারণ হলো আমাদের দেশে ভ্যাট সংস্কার নিয়ে যেকোনো কথা বলা প্রথমে শুরু করে মূলত দাতা গোষ্ঠী ও সংস্থা। তারপর আমাদের দেশের কিছু অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী সেই কথাগুলো শুধু আওড়াতে থাকেন। এভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে চলে আসে, বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাপা পড়ে যায়।

বাংলাদেশে ভ্যাট সংস্কার নিয়ে যে কয়েকটা কথা খুব বেশি বলা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো, একক ভ্যাট হার। বাংলাদেশে বর্তমানে ভ্যাটের হার রয়েছে মূলত ১০টি, এগুলো হলো ১৫, ১০, ৭.৫, ৫, ৪.৫, ৪, ২.৪, ২, ১.৫, ও ০ শতাংশ। তবে ভ্যাটযোগ্য বেশির ভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে। অন্য যে হারগুলো রয়েছে, সে হারগুলোর ভিত্তি খুব কম। তারপরও বলা হয় যে একক ভ্যাট হার প্রবর্তন করা দরকার। অর্থাৎ হ্রাসকৃত যে হারগুলো রয়েছে, সেগুলো ১৫ শতাংশে উন্নীত করা দরকার।

১৫ শতাংশ ও হ্রাসকৃত ভ্যাট হারের অবদান কতটুকু

পণ্য ও সেবার সংখ্যার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বর্তমানে অধিকাংশ পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে। ভ্যাট আইনের তৃতীয় তফসিলে মূলত হ্রাসকৃত ভ্যাট হারবিশিষ্ট পণ্য ও সেবা উল্লেখ আছে। উক্ত তফসিল অনুসারে, ৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে মাত্র ৬০টি হেডিংয়ের পণ্যের বিপরীতে উৎপাদন স্তরে এবং ৭টি সেবার ওপর। সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে উৎপাদন স্তরে মাত্র ৭টি হেডিংয়ের পণ্যের ওপর এবং মাত্র ২টি সেবার ওপর। উৎপাদন স্তরে কোনো পণ্য ১০ শতাংশ ভ্যাট হারের আওতায় নেই, মাত্র ৫টি সেবার ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে।

নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট (ফিক্সড ভ্যাট) প্রযোজ্য রয়েছে উৎপাদন স্তরে ২২টি হেডিংভুক্ত পণ্যের ওপর এবং ১টি মাত্র সেবার ওপর। এর বাইরে শত শত পণ্যের ওপর আমদানি ও উৎপাদন স্তরে এবং অন্যান্য সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য। ব্যবসা (ট্রেডিং) স্তরে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রয়োগ করা বিক্রেতার স্বাধীনতা। তাহলে দেখা যায় যে বর্তমানে আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের পরিমাণের দিক বিবেচনা করলে, আমাদের দেশে যেসব পণ্য ও সেবার ওপর বর্তমানে অধিক পরিমাণ ভ্যাট আদায় হয় অর্থাৎ মূল ভ্যাট প্রদানকারী সব পণ্য ও সেবার ওপর বর্তমানে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ। মূল ভ্যাট আদায় হয় এমন পণ্য ও সেবাগুলো হলো সিগারেট, গ্যাস, ওষুধ, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য, বিড়ি, সিমেন্ট, বেভারেজ, সাবান ও ডিটারজেন্ট, টেলিফোন, ব্যাংকিং, ইজারাদার, পণ্যাগার, বিমা, হোটেল ইত্যাদি। বেশি ভ্যাট প্রদানকারী মাত্র তিনটি সেবার ক্ষেত্রে বর্তমানে হ্রাসকৃত ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে। এগুলো হলো নির্মাণ সংস্থা (ঠিকাদার) ১০ শতাংশ, জোগানদার ১০ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিতরণকারী ৫ শতাংশ।

সারা বিশ্বে কী আছে

সারা বিশ্বের ১৪২টি দেশের ভ্যাট হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ৭০টি দেশে হ্রাসকৃত ভ্যাট হার রয়েছে। এমনকি অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেনের মতো দেশে হ্রাসকৃত ভ্যাট হার রয়েছে। অর্থাৎ হ্রাসকৃত ভ্যাট হার একটা বাস্তবতা। অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক ইত্যাদি প্রয়োজনে হ্রাসকৃত ভ্যাট হার থাকতে পারে। হ্রাসকৃত ভ্যাট হার থাকা কোনো সমস্যা নয়। আবার হ্রাসকৃত ভ্যাট হার না থাকা সব সমস্যার সমাধান নয়।

দেশে ভ্যাটের একক হারের প্রেক্ষাপট

সাধারণত সুষম অর্থনীতিতে ভ্যাটের একক হার প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় এবং প্রয়োগ করা সহজ হয়। তাই অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিজি, জর্জিয়া, ইসরায়েল, জ্যামাইকা, দক্ষিণ কোরিয়া, লেবানন, মরিশাস, নেদারল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান—এসব দেশ একক ভ্যাট হার প্রবর্তন করেছে। অসম অর্থনীতিতে বিভিন্ন ভ্যাট হার প্রয়োগ করার প্রয়োজন রয়েছে। এমন অর্থনীতিতে একক ভ্যাট হার বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাই আলজেরিয়া, ব্রাজিল, সাইপ্রাস, চেক রিপাবলিক, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, পানামা, তিউনিশিয়া, ভেনেজুয়েলা ইত্যাদি দেশে একাধিক ভ্যাট হার চালু রয়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সুষম নয়। তাই এমন অনেক দেশের মতো আমাদের দেশে একাধিক ভ্যাট হার থাকাই স্বাভাবিক।

১৫ শতাংশ হলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে আমাদের দেশে বর্তমানে অধিকাংশ পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে? এসব ক্ষেত্রে কি ভ্যাট ফাঁকি হয় না? উত্তর হলো কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি, অনেক ভ্যাট ফাঁকি হয়। তাহলে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অবশিষ্ট যেসব পণ্য ও সেবাগুলোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য নেই, সেসব পণ্য ও সেবাগুলোকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারের আওতায় আনা হলেও সব সমস্যার সমাধান হবে না।

সমস্যার শিকড় কোথায়, সেটা বুঝতে হবে। আমাদের দেশের ভ্যাটব্যবস্থায় ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ নাকি হ্রাসকৃত, তা মূল সমস্যা নয়। মূল সমস্যা হলো বিক্রেতা বিক্রি গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দেয়। বিক্রির তথ্য গোপন করে না, এমন প্রতিষ্ঠান বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিক্রির প্রকৃত পরিমাণ নির্ণয় করতে পারলে বর্তমানে যে ভ্যাট হার প্রযোজ্য রয়েছে, সেই ভ্যাট হার প্রয়োগ করেই ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

হ্রাসকৃত ভ্যাটই বেশি আদায় হয়

প্রাথমিকভাবে শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ কথা সত্য যে ১৫ শতাংশ অ্যাট হারের তুলনায় হ্রাসকৃত হারে সরকার বেশি রাজস্ব পায়। ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধকারীকে উপকরণ কর রেয়াত দেওয়া হয়। হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট পরিশোধকারীকে উপকরণ কর রেয়াত দেওয়া হয় না। তাই দেখা যায় যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করে উপকরণ কর রেয়াত নেওয়া হলে প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ রেয়াত নেওয়া হয়। অর্থাৎ ৩ থেকে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রকৃত অর্থে পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট পরিশোধ করা হলে যেহেতু উপকরণ কর রেয়াত পাওয়া যায় না, সেহেতু সরাসরি ৫ শতাংশ, সাড়ে ৭ শতাংশ, ১০ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়।

তাই হ্রাসকৃত হারে সরকারের রাজস্ব আদায় বেশি হয়। অর্থাৎ এখন যেসব ক্ষেত্রে হ্রাসকৃত ভ্যাট হার রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রবর্তন করা হলে রাজস্ব আহরণ কমে যেতে পারে। তাহলে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রয়োগ করার কথা বলে তাদের মূল যুক্তি কি? আমি যত দূর জানি, তাদের মূল যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা।

তবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা দেশি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বাস্তবায়ন করা না হলে দেশের কল্যাণের চেয়ে অনেক সময় অকল্যাণ বেশি হয়, এ কথাও স্মরণে রাখা দরকার। তাদের আর একটা যুক্তি হলো সব উপকরণ কর রেয়াত নিলে আদর্শ ভ্যাট ব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব হবে। তবে সে জন্য সব ক্ষেত্রে ভ্যাট চালানপত্র জারি করতে হবে। ভ্যাট চালানপত্র জারি নিশ্চিত না করে একক ভ্যাট হার বাস্তবায়ন করার চেষ্টা আর একটা ব্যর্থতা হবে।

অন্যদিকে ভ্যাট চালানপত্র জারি নিশ্চিত করা হলে বর্তমানে যে ভ্যাট হার রয়েছে, সে হারেই ভ্যাট আহরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। তখন সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রয়োগ করাও সহজ হবে।

মূল সমস্যা বিক্রির তথ্য গোপন করা

ভ্যাটের হার যা–ই হোক না কেন, যদি সব বিক্রি রেকর্ড করা সম্ভব হতো, তাহলে আমাদের দেশে ভ্যাট আদায় কয়েক গুণ বেড়ে যেত। আশা করি, এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না যে অধিকাংশ বিক্রেতা প্রকৃত বিক্রির ওপর ভ্যাট পরিশোধ করে না।

এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানের সিএ অডিট রিপোর্টে প্রদর্শিত বিক্রির পরিমাণ এবং ভ্যাট দাখিলপত্রে প্রদর্শিত বিক্রির পরিমাণে কোনো কোনো সময় বিস্তর পার্থক্য পাওয়া যায়, অল্প পার্থক্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই থাকে। বাজারে কিনতে গেলে সাদা চোখে দেখা যায় যে কী পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি হচ্ছে। ভ্যাট চালানপত্র দেওয়ার এবং নেওয়ার সংস্কৃতি এখনো আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। তাই বাংলাদেশে ভ্যাট সংস্কারের মূল ফোকাস হওয়া দরকার বিক্রির তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড করা অর্থাৎ ইনভয়েস অটোমেশন। ইনভয়েস অটোমেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ভ্যাটযোগ্য, ভ্যাটযোগ্য নয় বিক্রির সব ইনভয়েস অটোমেটেড পদ্ধতিতে জারি করে সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণ করার মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের সফলতা। এই সফলতার ব্যাপ্তি ভ্যাটের ক্ষেত্র ছাড়িয়ে আয়কর, হিসাব ও ডেটা ব্যবস্থাপনায় পৌঁছে যাবে। এ কাজ কঠিন নয়। প্রয়োজন হলো সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ।

মো. আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম ও ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।