প্রথম আলো: প্রায় পাঁচ দশকের পথচলায় নির্মাণ ব্র্যান্ডের লক্ষ্য অনুযায়ী সাফল্যগুলো আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাহাত কামাল: ১৯৭৬ সালে আমার বাবা প্রয়াত কে জেড ইসলাম নির্মাণ ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমাদের ব্যবসায়ের মূল দর্শন হলো ‘প্রুফ ওভার প্রমিজ’; অর্থাৎ ফাঁকা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব কাজের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করা। গত ৫০ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন, সেনাকল্যাণ ভবন ও ব্র্যাক সেন্টারের মতো দেশের বহু ঐতিহ্যবাহী ও আইকনিক স্থাপনা আমরা তৈরি করেছি। ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে সেনাকল্যাণ ভবন নির্মাণের সময়ই আমার বাবা দূরদর্শী চিন্তা থেকে জাপান থেকে ফেয়ার-ফেস কনসালট্যান্ট নিয়ে এসেছিলেন। গুণগত মান ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে আবাসন ইন্ডাস্ট্রির চেয়ে অন্তত দুই ধাপ এগিয়ে থাকাই আমাদের মূল ঐতিহ্য।
প্রথম আলো: আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বয়ে আপনারা বর্তমানে কী ধরনের নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন?
রাহাত কামাল: আমরা এমন আধুনিক স্থাপনা নির্মাণে গুরুত্ব দিচ্ছি, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের বাণিজ্যিক ভবন ‘মিরাই’ আন্তর্জাতিক লিড গোল্ড সনদ পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে বাইরে থেকে তীব্র উত্তাপ ও কোলাহল কমানোর জন্য আধুনিক বিশেষ গ্লাস এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী সেন্ট্রাল চিলার এসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের প্রকল্পগুলোতে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি), সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিশ্বমানের আধুনিক ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া বাতাসের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা নিখুঁতভাবে যাচাই করতে আমরা ইতালিতে উইন্ড-টানেল টেস্টও করিয়েছি।
প্রথম আলো: নির্মাণের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্রাহকদের কাছে প্রকল্প হস্তান্তরের বিশেষ কৌশল কী?
রাহাত কামাল: আমরা সব সময় ‘কম প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং বেশি নিশ্চত করার’ নীতিতে বিশ্বাস করি; অর্থাৎ গ্রাহককে যতটুকু প্রতিশ্রুতি প্রদান করি, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি মানসম্পন্ন সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের নিজস্ব একটি শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণ টিম রয়েছে। নির্মাণসাইটে রড বাঁধা থেকে শুরু করে শাটারিং বা ব্যবহৃত উপকরণের মান শতভাগ নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু হতে দেওয়া হয় না। পাশাপাশি ভবন নির্মাণের সব স্তরে বিআইএম প্রযুক্তির সাহায্যে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই ভবনে একটি ডিজিটাল প্রতিলিপি তৈরি করি। এটি নির্মাণে নজর রাখার পরিবর্তে সম্ভাব্য বাধা ও সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করছে।
প্রথম আলো: নতুন প্রজন্মের আবাসন চাহিদা পূরণে আপনাদের বিশেষ চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা কেমন?
রাহাত কামাল: বর্তমান যুগের আধুনিক কর্মজীবী তরুণ দম্পতিদের আবাসন চাহিদা আগের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। কেবল অনেকগুলো বেডরুম পাওয়ার চেয়ে তাঁরা ফ্ল্যাটে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার স্থান, সবুজ বাগান এবং উন্নত জিমনেসিয়ামের সুবিধা বেশি চান। মানুষের জীবনের প্রায় ৯০ শতাংশ সময় অতিবাহিত হয় বাসগৃহ ও কর্মস্থলে। তাই এই জায়গাগুলোকে দৃষ্টিনন্দন, স্বাস্থ্যকর ও সতেজ রাখা জরুরি। আমাদের ভবিষ্যৎ মূল পরিকল্পনা হলো ১০ থেকে ২০ বিঘা জমিতে সমন্বিত ‘গেটেড কমিউনিটি’ গড়ে তোলা, যেখানে একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যেই খেলার মাঠ থেকে শুরু করে সব আধুনিক নাগরিক সুবিধা থাকবে।
প্রথম আলো: দেশের আবাসন খাতের বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জ দূর করতে সরকারের নীতিগত জায়গা থেকে কী ভূমিকা রাখা উচিত?
রাহাত কামাল: ঢাকা শহরের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমাণ সীমিত, তাই এখানে পরিকল্পিতভাবে উঁচু ভবন নির্মাণ করতেই হবে। নীতিগত দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকার নিজে ভবন তৈরি না করে কেবল একটি নিয়মনীতি নির্ধারণকারী তদারকি সংস্থা হিসেবে কাজ করলে এই খাতের উন্নয়ন সহজ হবে। এ ছাড়া বড় জমি বরাদ্দ দিলে অভিজ্ঞ ডেভেলপাররা বিশ্বমানের টেকসই প্রকল্প তৈরি করে দিতে পারবে।