ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ট্রাম্পের নজর কেন, কী আছে সেখানে

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরোছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার নিকোলা মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচার করছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানা রকম চাপ প্রয়োগের পর শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

কিন্তু ভেনেজুয়েলা সরকার এই দাবি অগ্রাহ্য করেছে। তারা বলছে, দেশের তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় এ রকম ন্যক্কারজনক অভিযানের পেছনে আছে দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলসম্পদ দখলের পাঁয়তারা।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তিনি আরও যা বলেন, তাতেও বিষয়টি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প দখলের জন্য এ কাণ্ড করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘অনেক টাকা আয় করতে পারবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিকে (বিশ্বের সবচেয়ে বড়) ভেনেজুয়েলায় পাঠাব। তারা হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে; ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো ঠিক করবে। এই তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার হয়ে আয় করবে’।

ট্রাম্প আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’; অনেক দিন ধরেই তাদের এ অবস্থা। তাঁর ভাষায়, ‘যতটা তেল তারা তুলতে পারত, সে তুলনায় তারা প্রায় কিছুই তুলতে পারেনি।’

ভেনেজুয়েলার তেল কেন প্রয়োজন

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক—এ ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যে তেল উৎপাদন করে, তা মূলত হালকা ও অপরিশোধিত ধরনের। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ তেল পরিশোধনাগারের যে সক্ষমতা, তাতে তাদের ভারী ও অপরিশোধিত তেল প্রয়োজন।

অন্য কথায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের দেশের রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলোয় নিয়মিত পেট্রল সরবরাহ করতে চায়, তাহলে তাদের এই থিকথিকে ও ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

এ–ই হচ্ছে বাস্তবতা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ কারণে নিকট ভবিষ্যতে কেউই তা করতে বিশেষ আগ্রহী নয়।

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করলেও ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে দেশটিকে এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা অপরিশোধিত তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়।

এ বাস্তবতা মাথায় রাখলেই সমীকরণ মেলানো সম্ভব। এ সমীকরণ অনিবার্যভাবে ভেনেজুয়েলার দিকেই নিয়ে যায়। কেননা, কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায়।

কত মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়

এনার্জি ইনস্টিটিউটের হিসাব বলছে, বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলার হাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।

একসময় ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারির পর সেই সম্পর্ক বদলে গেছে। এখন দেশটির তেলের প্রধান গন্তব্য চীন।
একসময় বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রভাবশালী ছিল ভেনেজুয়েলা। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় আগে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটে—দেশটির তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে। নিকোলা মাদুরোর শাসনে সেই পরিস্থিতি আরও গভীর হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ তেলশিল্প কার্যত ভেঙে পড়েছে, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের হিসাবে ভেনেজুয়েলা এখনো ঠিক ‘শূন্যের কোঠায়’ না পড়লেও বাস্তবে তারা প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

উড়োজাহাজ থেকে নামছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বিমানঘাঁটি, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

১৯৭০-এর দশকে প্রতিদিন সাড়ে ৩ মিলিয়ন বা ৩৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল উত্তোলন করত দেশটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। দেশটির দৈনিক উৎপাদন কমতে কমতে ২০২০ সালে মাত্র পাঁচ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকে।
এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বর্তমানে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেলের সামান্য বেশি। এর বড় অংশই দেশটির নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় বৈশ্বিক বাজারের ১ শতাংশের কম, যে বাজারের আকার এখন দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি।

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের বর্তমান অবস্থা

হুগো চাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর সময় পিডিভিএসের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং বিদেশি চুক্তি পুনর্বিন্যাস করা হয়। তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

চাভেজের আমলে তেল থেকে আয়ের বড় অংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা হয়। এতে দেশটি সামাজিক সূচকে প্রাথমিকভাবে উন্নতি করে।

চাভেজ তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন। এতে কিছু মার্কিন কোম্পানি ভেনেজুয়েলা থেকে বেরিয়ে যায়, যদিও শেভরনের মতো কোম্পানি সীমিত অংশীদারি রেখে ব্যবসা চালিয়ে যায়। চাভেজের নীতির কারণে দেশটির তেলক্ষেত্র থেকে অভিজ্ঞ কর্মী ঝরে পড়ে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ থমকে যায়। উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে তেলশিল্পের কাঠামোগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। নিকোলা মাদুরো একই নীতি বজায় রাখেন।

বিপুল তেলের মজুত থাকলেও ভেনেজুয়েলার উৎপাদন যে নগণ্য, তার কারণ বুঝতে এই পটভূমি জানা প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসের হাতে উৎপাদন বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় পুঁজি ও দক্ষতার ঘাটতি আছে।

গবেষণা সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর পর্যাপ্ত খনন না হওয়া, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ঘন ঘন বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ও যন্ত্রপাতি চুরির কারণে তেলক্ষেত্রগুলোর অবস্থা শোচনীয়।

চাভেজের আমলে অনেক পশ্চিমা তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যায়। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় কাজ করা একমাত্র বড় পশ্চিমা তেল কোম্পানি হচ্ছে শেভরন। দেশটির মোট তেল উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শেভরনের মাধ্যমে হয়। তাদের উৎপাদিত তেলের প্রায় অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তেলশিল্প

এ বাস্তবতায় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর হাতে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প চলে যাবে—এমনটা মনে করা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কাগজে-কলমে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেলের বেশি হিস্যা পেলে তারা দেশটির তেলশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। তবে এনার্জি অ্যাসপেক্টসের ভূরাজনীতি বিভাগের প্রধান রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেন, ‘বিষয়টি মোটেও সহজ কিছু নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির খরচ অনেক বেশি। এনার্জি অ্যাসপেক্টস হিসাব করেছে, দৈনিক তেল উৎপাদন আরও ৫ লাখ ব্যারেল বাড়াতে অন্তত ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর।

এ থেকেই বোঝা যায় চ্যালেঞ্জ ঠিক কতটা। উৎপাদন আরও বেশি হারে বাড়াতে হাজার হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। সময় লাগবে কয়েক দশক।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার সরকার পতনের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে; যদিও তাদের সামনে বন্ধুর পথ। সেখানে গিয়ে তারা জটিল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের পণ্যবিষয়ক প্রধান হেলিমা ক্রফট বিনিয়োগবিষয়ক নোটে এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্পের চাপের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ‘অনেকটা সরকারি দায়িত্বের মতো করে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে নামতে হতে পারে’।
ট্রাম্প ব্যবসায়ী মানুষ। সবকিছুকেই তিনি ব্যবসায়িক স্বার্থে দেখেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থাকে অগ্রাহ্য করে তিনি বিশ্বায়নকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছেন; যদিও এই বিশ্বায়নব্যবস্থা গড়ে তোলায় যুক্তরাষ্ট্রই একসময় নেতৃত্ব দিয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসনও সেই ব্যবসায়িক স্বার্থ বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। সেই সঙ্গে ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিশ্বাস করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই। এ প্রসঙ্গে তাঁর সেই বিখ্যাত স্লোগান মনে রাখা যেতে পারে, ‘ড্রিল বেবি, ড্রিল’। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়াও। এ স্লোগান মনে রাখলে অনেক কিছুর উত্তর পাওয়া সম্ভব।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, স্কাই নিউজ, বিবিসি