বাজেটে বিলাসী পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ ইতিবাচক পদক্ষেপ। ৬০টি পণ্যে উৎসে কর কমানো এবং মসলাপণ্যে নিয়ন্ত্রকমূলক শুল্ক তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমবে। তবে খুব বেশি কমার সুযোগ নেই।
দুটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এত দিন প্রতি কেজি এলাচিতে ৫০০ টাকা শুল্ক ও কর ছিল। সেখান থেকে ৬০ টাকা শুল্ক ও কর কমবে। অন্যদিকে প্রতি কেজি জিরা আমদানিতে ২০০ টাকা শুল্ক ও কর আছে। সেখান থেকে ১৫ টাকা শুল্ক ও কর কমবে। ফলে বাজেটের সুফল খুব বেশি মিলবে না। তার পরও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে নিত্যপণ্যের দাম কমাতে অর্থমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে।
আগামী অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটটি অনেকটা উচ্চাভিলাষী মনে হয়েছে। আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বাজেটটি করলে সেটি বাস্তবসম্মত হতো। আপনি ১২০ তলা ভবন করার স্বপ্ন দেখছেন, অথচ আপনার পকেটে আছে মাত্র ২০ টাকা। তাহলে তো সেই ভবন আপনি করতে পারবেন না। তাই যতটুকু আয়, সে অনুযায়ী বাজেট করা দরকার ছিল।
খুচরা ব্যবসায়ীদের পণ্য সরবরাহের ওপর হাজারে ২ টাকা অগ্রিম কর আদায়ের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই। তার কারণ করের আওতা বাড়াতে হবে। তা না হলে যাঁরা কর দিচ্ছেন, তাঁদের ওপরই চাপ বাড়বে। তবে এই নতুন অগ্রিম কর আদায়ে এনবিআরকে উদ্যোগী হতে হবে। আবার সব ব্যবসায়ী যদি কর না দেন, তাহলে বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে।
আবার ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সারা দেশে এলাকা ও মার্কেটভিত্তিক ব্যবসার ধরন ও আর্থিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে অভিন্ন হারে সীমিত পরিমাণে সুনির্দিষ্ট টার্নওভার কর দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কর দিতে চান না। আবার একেক ব্যবসা একেক রকম। ফলে এ ধরনের কর আদায়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে এনবিআর ব্যবসার ধরন অনুযায়ী কর নির্ধারণ করে দিতে পারে। এরপর যদি কেউ কর না দেন, তাঁদের শাস্তির বিধান করতে হবে।
বড় বাজেটে বড় ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি মোকাবিলায় অর্থমন্ত্রী ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। ব্যাংক থেকে সরকার যদি এই বিপুল অর্থ ঋণ নেয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবেন না। সরকারকে ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়নি; কিন্তু সরকারই যদি ব্যাংকের অর্থের বড় অংশ ঋণ নিয়ে নেয়, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে না।
সরকার বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি ও ভাতা দিচ্ছে। এই ভর্তুকির অর্থ যেন অপচয় না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া ভাতার টাকা যেন প্রকৃত মানুষের হাতে যায়, সেটিও ভালোভাবে তদারকি করা দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় ভুল মানুষের হাতে ভর্তুকির টাকা গেলে সমাজের একটি অংশ অলস হয়ে পড়বে।
বাজেট যেটা করা হয়েছে, সেটির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর; আর সরকারকে অবশ্যই কৃষি ও রপ্তানি খাতে বিশেষ নজর দিতে হবে।
গোলাম মওলা, সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতি