বন্দরের সেবা মাশুল বাড়ানো হচ্ছে। বন্দরে সেবা মাশুলের বড় অংশই প্রথম ধাপে পরিশোধ করেন আপনারা। মাশুল বাড়ানোর বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ফাইয়াজ খন্দকার: বন্দরের সেবা মাশুল বাড়ানোর বিষয়ে অনেক দিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। সর্বশেষ গত ২ জুন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনসহ কয়েকটি সংগঠন ৩০ জুনের মধ্যে মাশুল কত বাড়ানো যৌক্তিক, তার প্রস্তাবনা জমা দিয়েছিল। এই প্রস্তাবনার ওপর দ্বিতীয় দফায় আলোচনার পর মাশুলের হার কত বাড়ানো হবে, তা চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা দেখলাম, মাশুল চূড়ান্ত হয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। আলোচনার মাঝপথে একসঙ্গে গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি মাশুল বাড়ানোর খবরে আমরা অবাক হয়েছি।
সরকারের ভাষ্য হচ্ছে, মাশুল বাড়ানোর পরও বিশ্বের অনেকে দেশের বন্দরের মাশুলের তুলনায় এখনো কম। আপনার কী মতামত?
ফাইয়াজ খন্দকার: চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মানের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর বন্দর বা মালয়েশিয়ার কেলাং বন্দর, অর্থাৎ উন্নত বন্দরগুলোর তুলনা করে মাশুল আদায়ের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কারণ, চট্টগ্রাম বন্দরে এখন একটি কনটেইনার জাহাজ জেটিতে ভেড়ানোর আগে চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। জেটিতে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ শেষ করতে সময় লাগে দু-তিন দিন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে একটি জাহাজ ছয় থেকে সাত দিন অবস্থান করতে হয়। উন্নত বন্দরগুলোয় এক দিনেই সব কাজ শেষ হয়ে যায়। উন্নত বন্দরের তুলনায় সেবার মানে চট্টগ্রাম পিছিয়ে আছে।
সেবার মানে পিছিয়ে থাকার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর রুটে চলাচলকারী জাহাজের খরচও বেশি। যেমন চট্টগ্রাম বন্দর রুটে যেসব কনটেইনার জাহাজ চলাচল করে সেগুলোর ভাড়া এখন গড়ে দিনে ১৫ হাজার ডলার। তাহলে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের জন্য সব মিলিয়ে এক লাখ ডলারের কমবেশি শুধু জাহাজভাড়াই গুনতে হয়। উন্নত বন্দরগুলোয় এই বাড়তি ভাড়া দিতে হয় না, কারণ এক দিনেই সব কাজ শেষ হয়। সেবার মান যদি উন্নত বন্দরগুলোর মতো হতো, তাহলে মাশুল বাড়ানোর বিষয়টি যৌক্তিক ছিল।
বর্তমানে একটি কনটেইনার জাহাজের জন্য সব মিলিয়ে কত ডলার মাশুল দিতে হয়? নতুন মাশুল কার্যকর হলে কত হতে পারে?
ফাইয়াজ খন্দকার: একটি জাহাজের মাশুল কত হবে, তা জাহাজের আকার, কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যাসহ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। তবে সাদামাটাভাবে বলা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি মাঝারি আকারের নিজস্ব ক্রেনযুক্ত জাহাজের সব মিলিয়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার ডলারের মাশুল দিতে হয়। নতুন মাশুল কার্যকর হলে তা ৮৫ থেকে ৯০ হাজার ডলারে উন্নীত হতে পারে।
এই মাশুল কারা পরিশোধ করে?
ফাইয়াজ খন্দকার: কনটেইনার জাহাজ ও কনটেইনার খাতের বেশির ভাগ মাশুল প্রথমত শিপিং কোম্পানিগুলো পরিশোধ করে। শিপিং কোম্পানিগুলো কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া নেওয়ার সময় তা আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক থেকে আদায় করে নেয়। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যখন আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক থেকে কোনো কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া নেয় শিপিং কোম্পানিগুলো তখন টার্মিনাল হ্যান্ডেলিং চার্জ বা টিএইচসি নামে একটি খাত যুক্ত থাকে। বন্দর যেসব মাশুল আদায় করে তা টিএইচসি খাতের অন্তর্ভুক্ত। স্বাভাবিকভাবে বন্দর মাশুল বাড়ালে এই চার্জও বাড়বে।
সাধারণত মাশুল বাড়ানোর ১৫ থেকে ২০ দিন শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি মাশুলের ব্যয় বহন করে। এরপর আমদানি-রপ্তানিকারকদের ওপর কার্যকর হয়। আর দিন শেষে আমদানিকারকেরা যখন পণ্য বাজারজাত করবেন, তখন এই বাড়তি মাশুল তাঁরা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করবেন। অর্থাৎ দিন শেষে বন্দরের বাড়তি মাশুল ভোক্তার পকেট থেকেই যাবে।
তাহলে ভুক্তভোগী হবে ভোক্তারা?
ফাইয়াজ খন্দকার: হ্যাঁ, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দিন শেষে ভোক্তারাই এই বাড়তি মাশুল দেবেন। রপ্তানির ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে কম মূল্যের পণ্য যারা রপ্তানি করে, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, মাশুল বাড়ানো হলে চট্টগ্রাম থেকে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে। এতে বাংলাদেশ থেকে কম মূল্যের যেসব পণ্য রপ্তানি হয়, সেগুলোর রপ্তানিকারকেরা ভাড়া বাড়লে খরচ পোষাতে পারবে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বাড়ানোর প্রভাবে বৈশ্বিক শিপিং খাতে প্রতিক্রিয়া কী?
ফাইয়াজ খন্দকার: সাম্প্রতিক সময়ে বার্থ অপারেটরের মাশুল বাড়ানো হয়েছে। এরপর বেসরকারি কনটেইনার ডিপোয় কনটেইনার ব্যবস্থাপনার মাশুল বাড়ানো হলো। এখন বাড়তে যাচ্ছে বন্দরের মাশুল। হঠাৎ করে একের পর এক খাতে মাশুল বাড়ানোর কারণে বাংলাদেশে ব্যবসার খরচ বাড়ছে।
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশন কনটেইনারে পণ্য পরিবহন খাতের প্রতিনিধিত্ব করে। এই খাতে বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলো রয়েছে, যারা কনটেইনার ও কনটেইনার জাহাজ পরিচালনা করে। মাশুল বাড়ানোর প্রক্রিয়া জানানোর পর বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এখন মাশুল চূড়ান্ত করায় কনটেইনার ও কনটেইনার জাহাজ পরিচালনাকারী বিদেশি প্রিন্সিপালদের (মালিকপক্ষ) জানাব।