যাঁর সঞ্চয় সবচেয়ে কম, তাঁর কাছ থেকেই নেবে অতিরিক্ত রাজস্ব

আসিফ সালেহ, নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক।

এটা খুবই হতাশাজনক যে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর ওপর কর বসাতে চাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এমন মানুষদের কাছ থেকে কর নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যাঁদের গড় সঞ্চয় ১ লাখ টাকার কম। তাঁরা আবার বাণিজ্যিক আমানতকারীও নন এবং তাঁদের বেশির ভাগই গ্রামের নারী। সপ্তাহে ১০ টাকা, ২০ টাকা কিংবা ৫০ বা ১০০ টাকা করে এ সঞ্চয় তাঁরা জমিয়েছেন। কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য, কেউবা ঘরের চাল বদলানোর জন্য। কেউ আবার টাকা জমিয়েছেন হঠাৎ অসুখে পড়লে চিকিৎসা করার জন্য। সেই জমানো টাকা বা সঞ্চয়ের বিপরীতে সুদ তাঁদেরই প্রাপ্য। এনবিআর এখন সেই সুদের ওপর কর দাবি করছে বিগত বছরগুলোর জন্য। তা–ও অল্প সময়ের নোটিশে। বলা হচ্ছে আদায় না করতে পারলে এই কর দিতে হবে এখন ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোকে।

এখন দেখা যাক সিদ্ধান্তটি কোন বাস্তবতার ওপর এসে পড়ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপ আমাদের সামনে একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেছে। রূঢ় বাস্তবতার যে ছবিটি সামনে এসেছে, তা স্পষ্ট। আর সেটা হচ্ছে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে। অতিদারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

আরও পড়ুন

আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি হলো আয়-ব্যয়ের হিসাব। জাতীয়ভাবে একটি পরিবারের মাসিক আয় গড়ে ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা, আর ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়ের জন্য কার্যত কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। শহরের অবস্থা আরও খারাপ। আয় কমে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকায় নেমেছে, অথচ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকায়। প্রতি মাসেই ঘাটতি। মাসিক খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশই চলে যায় খাদ্যে। ২০২৬ সালে এই অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

যে চিত্রটা দেখা যাচ্ছে সেটা এভাবে বলতে পারি: আয় বাড়ছে না, খরচ বাড়ছে আর অনেক দরিদ্র মানুষ টিকে আছেন তাঁদের জমানো টাকা ভেঙে। ঠিক এমন সময়ে সেই জমানো টাকার সুদের ওপর কর বসানোর প্রস্তাব এসেছে।

সম্প্রতি আমরা দেখতে পেলাম যে সঞ্চয়টুকু একটি পরিবারকে দুর্দিনে ভাসিয়ে রাখছে, সেটির ওপরই হাত পড়ছে। যদিও রাজস্বের অঙ্কে এর প্রাপ্তি সামান্যই। কিন্তু বার্তাটি স্পষ্ট। যিনি সেই সঞ্চয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, যাঁর সঞ্চয় সবচেয়ে কম, তাঁর কাছ থেকেই নেওয়া হচ্ছে এই অতিরিক্ত রাজস্ব। আমরা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছি। অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি এবং তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে বিষয়টি দেখবেন। তা সত্ত্বেও সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কাছে এনবিআরের কাছ থেকে চিঠি আসা শুরু হয়েছে।

— আসিফ সালেহ, নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক