৩০১ ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত, বাংলাদেশের বাণিজ্য ভবিষ্যতের জন্য কী তাৎপর্য

সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেমপ্রথম আলো

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার অধীন দুটি পৃথক তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—একটি বৈশ্বিক শিল্প খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে এবং অন্যটি জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে। এতে বোঝা যায়, বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন আরও কঠোর অবস্থানে গেছে।

বাংলাদেশের জন্য এসব পদক্ষেপ দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক অঙ্গভঙ্গির চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলো দেশের রপ্তানি মডেলের মূল ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আরও সুরক্ষাবাদী বৈশ্বিক পরিবেশে বর্তমান বাণিজ্যকৌশল কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে।

প্রথম তদন্তটি হচ্ছে কথিত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। মনে হয়, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার যে বৃহত্তর প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছে, এটি তারই অংশ। সেই তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি তাৎপর্যপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি ডলারের বেশি বলে অনুমান করা হয়। মূলত টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এই বাণিজ্য। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত প্রতিযোগিতামূলক দামে বিপুল পরিমাণ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর ভর করে এগিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যে যুক্তিতে এই তদন্ত করছে, তাতে বোঝা যায়, এই সাফল্যই এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যখন ওয়াশিংটন বলে, বিদেশের ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’ যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তখন মূলত তারা প্রশ্ন তোলে—বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী অর্থনীতিগুলো কি এমনভাবে শিল্পশক্তি গড়ে তুলেছে, যার কারণে প্রতিযোগিতা ব্যাহত হচ্ছে?

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যাখ্যা বিতর্কযোগ্য। দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বড় অংশই ভারী শিল্পে ভর্তুকির কারণে নয়; বরং শ্রমঘন উৎপাদন, বেসরকারি উদ্যোক্তা উদ্যোগ ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। রপ্তানি প্রণোদনা অবশ্যই আছে এবং উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে চাওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সাধারণ বিষয়। এগুলো বাংলাদেশের জন্য একেবারেই ব্যতিক্রমী বিষয় নয়।

অভিযোগের সত্যতা আছে কি নেই, তা আমাদের জন্য ঝুঁকির বিষয় নয়; বরং এর পেছনের রাজনৈতিক গতিশীলতা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এখন তদন্তের ফল হিসেবে শাস্তিমূলক শুল্ক বা অন্যান্য বাণিজ্য–সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়ে যেতে পারে। অথচ এ খাতে দেশে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ খাত দেশের শিল্প খাতের রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু।

জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে তদন্তটি ভিন্ন, কিন্তু সংবেদনশীলতার দিক থেকে সমপর্যায়ের। সেই সঙ্গে বিষয়টি আমাদের সামনে নতুন মাত্রা নিয়ে আসে। ২০১৩ সালের রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়েছে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মান উন্নত হয়েছে, নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে। বলা বাহুল্য, বৈশ্বিক ক্রেতারা আরও কঠোর কমপ্লায়েন্স শর্ত আরোপ করেছে। তা সত্ত্বেও বলা যায়, শ্রম ব্যবস্থাপনা এখনো সেভাবে শক্তিশালী হয়নি। সরবরাহব্যবস্থার কিছু অংশে অনানুষ্ঠানিকতা আছে। শ্রম অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাজনিত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্ত বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে শ্রমমান নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাঁচামালের উৎস। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প—বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত—তুলা, সুতা ও কাপড়সহ বিভিন্ন কাঁচামালের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এসব কাঁচামালের একটি অংশ এমন দেশ বা অঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে আসতে পারে, যেখানে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে সরাসরি জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার না থাকলেও কাঁচামালের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং তা রপ্তানি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলের পূর্ণাঙ্গ উৎস যাচাই ও শ্রমমান যাচাইয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান জোর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য কাঁচামালের উৎস সম্পর্কে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলাও এখন অপরিহার্য।

নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে এখন ভারসাম্য রক্ষা করার সূক্ষ্ম চ্যালেঞ্জ আছে। দেশের উন্নয়ন মডেলকে সরলভাবে শোষণমূলক বা অন্যায্য হিসেবে উপস্থাপন করে—এমন প্রকৃতির সরল আখ্যান প্রতিহত করতে হবে। অন্যদিকে এসব তদন্ত থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। শ্রম পরিদর্শন, সরবরাহ–শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা ও কমপ্লায়েন্স পর্যবেক্ষণ আরও উন্নত করতে হবে—শুধু বিদেশি নজরদারি মেটানোর জন্য নয়, বরং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে তা করতে হবে।

আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে এ ঘটনাগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য–রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যে সময় কেবল রপ্তানি সাফল্যই বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করত, সেই যুগ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। এখন বাণিজ্য ক্রমে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শিল্পনীতি ও সামাজিক মানদণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে; এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কৌশলগত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, মূল্যশৃঙ্খলের উচ্চতর ধাপে অগ্রসর হওয়া ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

সেই অর্থে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এসব তদন্ত কেবল হুমকি হিসেবে দেখা উচিত নয়; এগুলো সতর্কবার্তাও বটে। এসব তদন্ত বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেয়, কেবল কম খরচ ও বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের দিকে এগোনো যাবে না। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা ক্রমে নির্ভর করবে বিশ্বাসযোগ্যতা, মানদণ্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ওপর।

সেলিম রায়হান: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, সানেম।