১৯৭০–এর দশকের তেল–সংকটের কথা মনে আছে, এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ

ভারতের আহমেদাবাদে পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিচ্ছেন যাত্রীরা। সাম্প্রতিক ছবি।
রয়টার্স

শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার জ্বালানি রেশনিং করছে। ফিলিপাইন পেট্রল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। বিদ্যুৎ বাঁচাতে বাংলাদেশে সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ে সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সারা ভারতেই দেখা যাচ্ছে, বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁয় গ্যাসের অভাবে কাঠের আগুনে রান্না হচ্ছে। এয়ারলাইনসগুলো উড়ান বাতিল করছে।

ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের প্রথম ধাক্কা যত কষ্টেরই হোক না কেন, সামনে যে পরিস্থিতি আসছে, তা আরও খারাপ হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে যেসব তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শেষ চালান এশিয়ার পথে রওনা হয়েছিল, সেগুলো এখন পৌঁছে যাওয়ার কথা। ইউরোপগামী শেষ ট্যাংকার চালানগুলোও এপ্রিলের মাঝামাঝি পৌঁছে যাবে। এরপর অনেক দেশের পেট্রল, ডিজেল, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাবে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরলের ভাষ্য, এবারের সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড়; জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি এর আগে কখনোই এতটা প্রকট হয়নি। এমনকি ১৯৭০–এর দশকের তেল–সংকটের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি খারাপ। কোভিড মহামারির চেয়েও। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি খারাপ। এবারের সংঘাতের পরিসর অনেক বড়। তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বৃহৎ পরিসর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত এই ঘাটতি পূরণের উপায় নেই।

এদিকে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশ আরও বেশি কয়লা পোড়াচ্ছে। যদিও আমি মনে করি, এ ধরনের সংকটের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে আরও ঝুঁকে পড়বে।

বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপে দ্রুতই এই পরিবর্তন ঘটবে। তেল ও গ্যাসের বদলে ব্যবহার করা যায়—এমন বিকল্প এখন আছে। যেমন সৌর প্যানেল, বায়ুচালিত টারবাইন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি। এই সবকিছুই এখন বাজারে সস্তায় ও সহজে মিলছে। এমন অবস্থায় এটি প্রথম তেল–সংকট।

জ্বালানির সরবরাহ সংকটে ইতিমধ্যে ভোক্তারা এসব প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত হচ্ছেন। ২৪ মার্চ ফিলিপাইন জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এরপর ম্যানিলায় গাড়ি কিনতে আসা মানুষেরা চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি বিওয়াইডির বিক্রয়কেন্দ্রে ভিড় করছেন। তাঁরা বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনছেন। জার্মানিতে সৌর পণ্যের বিক্রেতারা বলছেন, হঠাৎ করে গ্রাহকদের আগ্রহ বেড়েছে। ব্রিটেনে হিট পাম্প স্থাপন বাড়ছে। পাকিস্তানে বৈদ্যুতিক রিকশার বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। ভারতে অনলাইন বিক্রেতাদের ইনডাকশন কুকটপের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের বৃহৎ এক শিল্পগোষ্ঠী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা বাদ দিতে চায়। বাস্তবায়িত হলে এটি হতো সে দেশের এলএনজিভিত্তিক বৃহত্তম বিদ্যুৎকেন্দ্র। তারা এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি সঞ্চয় প্রকল্পে যেতে চায়। যুদ্ধ শুরুর পর চীনের সবচেয়ে বড় তিনটি ব্যাটারি কোম্পানির প্রতিটির বাজার মূলধন প্রায় ২০ শতাংশ করে বেড়েছে। সব মিলিয়ে এই বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন বা ৭ হাজার কোটি ডলার।

যেসব দেশ ভাবছে তারা দ্রুত পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে যাবে, তাদের জন্য পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয় হতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর যে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছিল, তাতে পাকিস্তান বড় ধাক্কা খায়। হঠাৎ করে গ্যাস আমদানির খরচ এত বেড়ে যায় যে গ্যাস কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে যেসব গ্যাসের চালান পাকিস্তানের পথে রওনা হয়েছিল, তার অনেকগুলোই পথ বদলে ইউরোপের ধনী দেশগুলোর দিকে চলে যায়।

ভিয়েতনামের এক পেট্রল পাম্পে তেল নিতে মানুষের ভিড়। সাম্প্রতিক ছবি।
রয়টার্স

কিন্তু চীন থেকে আসা সস্তা সৌর প্যানেল পাকিস্তানের জ্বালানিব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। বর্তমানে যে এলএনজি–সংকট চলছে, তার ধাক্কা থেকেও দেশটি কিছুটা সুরক্ষা পেয়েছে। এখন পাকিস্তানের প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে সৌরশক্তি থেকে। ২০২০ সালে তা ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের হিসাবে, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে পাকিস্তান এ বছর জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বাবদ ৭ বিলিয়ন বা ৭০০ কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারবে। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ বড় ধরনের কষ্ট থেকে বেঁচে গেছেন।

গবেষণাকেন্দ্রটির প্রধান বিশ্লেষক লাউরি মিলিভির্তা বলেন, সৌরশক্তির মাধ্যমে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

কাতারের রাস লাফান এলএনজি রপ্তানি স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এলএনজির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে হঠাৎ করেই বিশ্ববাজার থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই এলএনজি রপ্তানি স্থাপনা পুরোপুরি চালু করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে।

সেই সঙ্গে আরব অঞ্চলের অন্য উৎপাদকেরাও তেল ও গ্যাসের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তাঁদের সংরক্ষণাগার ভরে যাচ্ছে। এই কূপগুলো তো আর বৈদ্যুতিক সুইচের মতো নয় যে সঙ্গে সঙ্গে আবার চালু করা যাবে। উৎপাদন আবার বাড়াতে মাসের পর মাস লেগে যাবে। ফলে বিকল্প খোঁজার চাপ আরও বাড়বে।

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি

এই যুদ্ধের জেরে পরিবেশববান্ধব জ্বালানি খাতের ওপরও চাপ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বাড়লে নতুন জ্বালানি স্থাপনা ও গ্রিড প্রকল্পে অর্থ জোগাড় করা সমস্যাজনক হবে।

ট্রান্সফরমার, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাও এখন ব্যাহত হচ্ছে। বিশৃঙ্খলার কারণে সব কিছুই কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যয়বহুল হয়ে যায় সবকিছু, তা সে দূষণকারী জ্বালানির অবকাঠামো হোক বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির।

ভারতের মতো দেশগুলোকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে বিপুল পরিমাণে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বাড়তি চাহিদা মেটাতে সরকারকে ঠিক করতে হবে, নিজেদের দেশে সৌর প্যানেল, হিট পাম্প ও বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির কারখানায় তারা কতটা বিনিয়োগ করবে।

আমদানি করা পণ্যের ওপর কী হারে শুল্ক বসাবে, সেটাও ঠিক করতে হবে। জনস হপকিন্সের নেট জিরো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি ল্যাবের সহপরিচালক টিম সাহায় এমনটাই বলেছেন। তবে সরকার ও কোম্পানিগুলো দ্রুতই নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। বিশাল এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তুলনায় তা অনেক সহজ।

জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি কাজ। এর মানে শুধু আরও বেশি বায়ু, সৌরশক্তি ও ব্যাটারি বসানো নয়, বরং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তোলাও জরুরি। গৃহের তাপব্যবস্থা ও পরিবহন খাত বিদ্যুৎভিত্তিক করাও এর অংশ। জ্বালানিতে নিজেদের স্বনির্ভরতা বাড়লে দেখা যাবে, সব দেশেই বায়ুদূষণ কমেছে। এতে কার্বন নিঃসরণও অনেকটা কমবে।

এই পথে সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে চীন। গত এক দশকে তারা পরিবহন ও শিল্প খাতের বড় অংশে বিদ্যুতায়ন করেছে। দৈনিক তেল ব্যবহার ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি কমিয়েছে তারা। ফলে ইরান সংকটের সময় তারা বেশ সুরক্ষিত।

জনস হপকিন্সের নেট জিরো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি ল্যাবের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক গাড়ি, চার্জার, ব্যাটারি, সৌর, বায়ু ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি তৈরিতে অন্য দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে চীনা কোম্পানিগুলো ২২৭ বিলিয়ন বা ২২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।

টিম সাহায় বলেন, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার ধাক্কা চীনের গায়ে তেমন একটা লাগেনি। এর পেছনে আছে অনেক দিনের পরিকল্পনা। এর শুরু সেই ২০০৩ সালে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা করে। সেই ঘটনার পর তেলের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়তি ছিল। ওই সময় চীন এই প্রক্রিয়া শুরু করে।

যা হোক, সামনে আবারও ধাক্কা আসবে—এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সাহায়ের কথা হলো, তখন বিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা এই ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে বড় ভরসা হয়ে উঠবে। মার্কিন ভোক্তাদের সামনেও এই পথ খোলা আছে। তাঁরাও শিগগির বৈদ্যুতিক গাড়ি ও হিট পাম্পের দিকে ঝুঁকতে পারেন। কিন্তু এসব বিকল্প ব্যবস্থা সাশ্রয়ী করতে বিভিন্ন সময় যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সেগুলো প্রত্যাহার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট হিউস্টনে বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক জ্বালানি সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টাকে একধরনের মানবিক প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সত্যটা খুব সহজ, জ্বালানিই জীবন; সারা পৃথিবীরই আরও অনেক জ্বালানি দরকার।’

তাঁর এই কথায় যদি পরিহাস থাকে তাহলে বলতে হয়, এই পরিহাস বড় করুণ। ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সবখানে জ্বালানির দাম বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। এতে মানুষ অপ্রয়োজনীয় কষ্টের মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা গেল, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভবিষ্যৎ হচ্ছে আরও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুতের মধ্যে, আমাদের বরং সেদিকেই নজর দিতে হবে।

জোনাথন মিংলে: সাংবাদিক। তিনি জলবায়ু, জ্বালানি ও বায়ুদূষণ নিয়ে বই লিখেছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত