আটকে থাকা আমানতের সুদের ওপর করারোপ কি ন্যায়সংগত
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত গত কয়েক বছরে গভীর আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারল্যসংকট, আমানত ফেরতে বিলম্ব, মেয়াদোত্তীর্ণ ডিপিএস ও এফডিআর নগদায়নে সীমাবদ্ধতা এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক পুনর্বিনিয়োগ এখন বহু আমানতকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা। এই পরিস্থিতিতে করনীতিসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, একজন করদাতাকে কি এমন আয়ের ওপর কর দিতে হবে, যে আয় তিনি বাস্তবে কখনো হাতে পাননি?
প্রশ্নটি কেবল আইনগত নয়, এটি ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং করনীতির মৌলিক দর্শনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বাংলাদেশের করব্যবস্থার একটি মৌলিক উদ্দেশ্য হলো করদাতার প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি করব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন করদাতা ২০২০ সালে একটি ডাবল বেনিফিট এফডিআর স্কিমে ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই স্কিমটির মেয়াদ পূর্ণ হলে তাঁর প্রাপ্য হয় ১ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা মূলধন এবং ৫০ লাখ টাকা সুদ। ব্যাংক সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে ৫ লাখ টাকা উৎসে কর কেটে নিয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক উৎসে করের সনদও ইস্যু করতে পারেনি।
একই সময়ে কিছু ব্যাংকের তারল্যসংকটের কারণে করদাতাকে কোনো অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। বরং পুরো অর্থ পুনরায় এফডিআর হিসেবে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং বাধ্য হয়েই তাঁকে পুরো অর্থ পুনর্বিনিয়োগ করতে হয়। ফলে কাগজে তিনি ৫০ লাখ টাকা আয় করলেও বাস্তবে সেই অর্থ উত্তোলন, ব্যবহার বা ভোগ করার কোনো সুযোগ পাননি।
অথচ রিটার্ন দাখিলের সময় উৎসে কাটা করের অতিরিক্ত আরও কয়েক লাখ টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধের প্রয়োজন হতে পারে। ব্যাংকে আটকে থাকা আমানত ও অনাদায়ি সুদের এমন অভিজ্ঞতার কথা সাম্প্রতিক সময়ে বহু আমানতকারীর আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রশ্নটি তাই সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, যে আয় করদাতার হাতে আসেনি এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণেও নেই, সেই আয়ের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণ কর আরোপ কি ন্যায়সংগত?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৬২ অনুযায়ী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে পাওয়া সুদ বা মুনাফা ‘আর্থিক পরিসম্পদ হতে আয়’। ধারা ৬৩-তে এই আয় করযোগ্য হওয়ার সময় নির্ধারণে ‘প্রাপ্ত বা অর্জিত, যেটি আগে’ নীতি অনুসরণ করা হয়। ফলে ব্যাংক সুদ হিসাবভুক্ত করে গ্রাহকের নামে দায় সৃষ্টি করলেই তা ‘অর্জিত’ আয় হিসেবে বিবেচিত হয়, যদিও গ্রাহক অর্থটি তুলতে না পারেন।
একই আইনের ধারা ১০২ অনুসারে সুদ গ্রাহকের হিসাবে জমা বা প্রকৃত পরিশোধ, যেটি আগে ঘটে, সে সময় উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। এরপর ধারা ১৭৩ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের আগে মোট করদায় নিরূপণ করে উৎসে কর্তিত কর বাদ দিয়ে অবশিষ্ট কর পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ বর্তমান বিধানগুলো একসঙ্গে প্রয়োগ করলে নগদ অর্থ না পেয়েও একজন আমানতকারীর করদায় সৃষ্টি হওয়া আইনগতভাবে সম্ভব। এনবিআরের নির্দেশিকাতেও অর্জিত কিন্তু তখনো হাতে না পাওয়া স্থায়ী আমানতের সুদ ধারা ৬৩-এর আওতায় দেখানোর উদাহরণ রয়েছে।
কিছু ব্যাংক ও ব্যাংকগোষ্ঠীতে তারল্য, মূলধন, খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের সমস্যা যে গুরুতর, সরকারি ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে তা স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের হার ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ৯ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ২০ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে উন্নীত হয়। সর্বশেষ প্রাপ্য ত্রৈমাসিক তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা ব্যাংক খাতের মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই প্রতিবেদনের তারল্য-সহনশীলতা পরীক্ষায় ১৮টি তফসিলি ব্যাংক নির্ধারিত চাপ মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।
২০২৬ সালের জুনে বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান চাপের কথা উল্লেখ করেছে। এই বাস্তবতার স্বীকৃতিস্বরূপ আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন বাংলাদেশ ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত তফসিলি ব্যাংক পুনর্গঠন, ব্রিজ ব্যাংকসহ বিভিন্ন রেজোল্যুশন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা চাওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং আইন এখন স্বীকার করছে যে কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থায় আমানতকারীর অধিকার ও অর্থপ্রাপ্তি বিশেষ পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। অথচ কর আইনে একই পরিস্থিতিতে আটকে থাকা সুদের জন্য পৃথক কোনো ব্যবস্থা নেই।
কর আরোপের ভিত্তি হওয়া উচিত করদাতার প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। শুধু হিসাবের খাতায় একটি অঙ্ক যোগ হওয়া মানেই সেই অর্থ করদাতার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, এমনটি বলা যায় না।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, করদাতা স্বেচ্ছায় পুনর্বিনিয়োগ করছেন না, বরং ব্যাংকের আর্থিক অক্ষমতার কারণে নিজের অর্থই তুলতে পারছেন না। তাঁর আমানত কার্যত আটকে আছে। এমন অবস্থায় তাঁকে অতিরিক্ত কর দিতে বাধ্য করা ন্যায়সংগত কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত।
এখানে আরও একটি অসংগতি রয়েছে। উৎসে কর কর্তনের উদ্দেশ্য হলো কর সংগ্রহকে সহজ করা এবং করদাতার ভবিষ্যৎ করদায়ের সঙ্গে তা সমন্বয় করা। কিন্তু মূল অর্থই যদি পরিশোধ করা না হয়, তাহলে উৎসে কর কর্তন কার্যত এমন একটি আয়ের ওপর সম্পন্ন হচ্ছে, যা এখনো করদাতার দখলে আসেনি। এতে করদাতা একদিকে নিজের অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত করও পরিশোধ করছেন। ফলে করব্যবস্থা অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি আর্থিক বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এ এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। হয়তো আইন প্রণয়নের সময় এ ধরনের ব্যাংকিং সংকট এত ব্যাপকভাবে বিবেচনায় আসেনি। কিন্তু অর্থনীতি পরিবর্তিত হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতাও বদলেছে। তাই করনীতিকেও সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।
ব্যাংক যখন প্রকৃত অর্থই পরিশোধ করতে পারছে না, তখন উৎসে কর কীভাবে কর্তন করা হচ্ছে, এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কাগজে কর রাজস্ব পাচ্ছে, কিন্তু করদাতা তাঁর অর্থ পাচ্ছেন না। অর্থাৎ করদাতা একই সঙ্গে তারল্যসংকট ও করের দ্বৈত চাপে পড়ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু করদাতার প্রতি অন্যায্য নয়, বরং সঞ্চয় সংস্কৃতিকেও নিরুৎসাহিত করতে পারে। একজন সচেতন নাগরিক যদি দেখেন যে ব্যাংকে রাখা অর্থ না পেলেও তার ওপর কর দিতে হচ্ছে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চার সুপারিশ
এই বাস্তবতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সামনে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রথমত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অবিলম্বে একটি ব্যাখ্যামূলক পরিপত্র জারি করতে পারে, যাতে বলা হবে যে ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে অনাদায়ি সুদের ওপর কর প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির আগপর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
দ্বিতীয়ত, আয়কর আইন, ২০২৩-এ একটি বিশেষ বিধান সংযোজন করা যেতে পারে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে ব্যাংকের তারল্যসংকট, নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ বা আদালতের আদেশের কারণে অনাদায়ী সুদ প্রকৃত প্রাপ্তির আগে করযোগ্য হবে না।
তৃতীয়ত, উৎসে কর কর্তনের বর্তমান ব্যবস্থাও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। প্রকৃত অর্থ পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের ব্যবস্থা চালু করলে করদাতা, ব্যাংক এবং সরকারের স্বার্থের মধ্যে অধিকতর ভারসাম্য সৃষ্টি হবে।
চতুর্থত, সরকার রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে বর্তমান ব্যবস্থা বহাল রাখতে চাইলে অন্তত ধারা ১৭৩-এর অধীন অতিরিক্ত কর পরিশোধের ক্ষেত্রে একটি স্থগিত পরিশোধের বিধান চালু করা যেতে পারে। এতে করদাতা প্রকৃত অর্থ হাতে পাওয়ার পর অবশিষ্ট কর পরিশোধ করতে পারবেন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে বর্তমানে আস্থা পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এ সময়ে করনীতি যদি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে তা শুধু করদাতাদের জন্যই নয়, বরং সঞ্চয় সংস্কৃতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক বার্তা বহন করবে। করব্যবস্থা শুধু আইনের ভাষার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না, বরং এটি ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনআস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরিবর্তিত ব্যাংকিং বাস্তবতার আলোকে আয়কর আইন, ২০২৩-এর এই নীতিগত শূন্যতা পূরণ করা এখন সময়ের দাবি।
রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন। কিন্তু সেই রাজস্ব এমন আয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, যা করদাতা এখনো ভোগই করতে পারেননি। করনীতি তখনই টেকসই হয়, যখন তা রাজস্ব আহরণ এবং করদাতার ন্যায়সংগত অধিকার—উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার এখনই উপযুক্ত সময়।