অনাদায়ি ও আটকে থাকা ভ্যাট আদায়ের সুযোগ কাজে লাগবে কি

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসফাইল ছবি

মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট–সংক্রান্ত পুরোনো বিরোধ মিটিয়ে অনাদায়ি বা আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার একটি চমৎকার সুযোগ এনেছে।

অর্থ আইন, ২০২৬–এর মাধ্যমে ভ্যাট আইনে যুক্ত করা হয়েছে নতুন ধারা ‘১৩৭ক’। উদ্যোগটি খুবই ব্যবসাবান্ধব। ১৯৯১ সালের পুরোনো ভ্যাট আইন কিংবা ২০১২ সালের বর্তমান ভ্যাট আইনের আওতায় অনাদায়ি বা আটকে থাকা বকেয়া কর, উৎসে কর্তিত কর কিংবা জরিমানা বা অন্য কোনো পাওনার মতো দীর্ঘদিনের পাওনা সহজে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া। বিধান অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬—এই ছয় মাসের মধ্যে মাসিক ২ শতাংশ হারে মাত্র ২৪ মাসের সরল সুদ পরিশোধ করলেই পুরোনো বিপুল অঙ্কের করদায় থেকে চূড়ান্ত মুক্তি মিলবে।

সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু ছয় মাসের এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেখতে দেখতে তিন মাস ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে। বাকি আছে আর মাত্র তিন মাস। অথচ মাঠপর্যায়ে করদাতা কিংবা ভ্যাট কর্মকর্তা—সবাই কি জানেন কীভাবে বা কোন নিয়মে এই সুবিধা নেওয়া যাবে। আটকে থাকা বকেয়া কর আদায়ে আইনি বিধান থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় এত বড় একটি ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগের ফল বাস্তবে কি মিলছে?

আইনে বকেয়া পরিশোধের সুযোগের কথা বলা হলেও সাধারণ করদাতা ঠিক কীভাবে টাকা জমা দেবেন বা পুরোনো দায় থেকে কীভাবে মুক্তি পাবেন, তা নিয়ে রয়ে গেছে বড় কিছু ধোঁয়াশা আছে। যেমন:

১. আদালতের বিচারাধীন মামলা

ভ্যাট আপিল কমিশনারেট, আপিলাত ট্রাইব্যুনাল বা উচ্চ আদালতে অসংখ্য ভ্যাট মামলা ঝুলে রয়েছে। করদাতা বকেয়া পরিশোধ করলে এই মামলাগুলো কীভাবে প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি হবে, তা স্পষ্ট নয়।

২. স্থগিতাদেশ ও এডিআর

যেসব মামলায় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে বা যেগুলো বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে (এডিআর) চলমান, সেগুলোয় কর দেওয়ার আগে আদালতের পূর্বানুমতি লাগবে কি না, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

৩. শুধু সুদ বকেয়া থাকলে কী হবে

অনেক ক্ষেত্রে মূল কর পরিশোধ হলেও শুধু সুদ বা অন্য আনুষঙ্গিক পাওনা বকেয়া আছে। এই বিশেষ স্কিমের আওতায় তা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা পরিষ্কার নয়।

৪. নিরীক্ষা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ

অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে কিংবা শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত দাবিনামা জারি হয়নি। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কীভাবে এই সুবিধা নেবে, আইনে সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।

বাস্তবতা হলো, আইনে শুধু একটি নতুন ধারা যোগ করলেই সরকারি কোষাগারে রাজস্ব চলে আসবে না। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দ্রুত কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন:

১. সহজ বাস্তবায়ন নির্দেশিকা প্রকাশ

করদাতা কখন, কোথায় ও কীভাবে আবেদন করবেন, কোন কোডে টাকা জমা দেবেন এবং মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া কী হবে, তা পরিষ্কার করে অবিলম্বে একটি আদেশ জারি করা এবং তা গণমাধ্যমে প্রচার করা দরকার।

২. করদাতাদের খুঁজে বের করে যোগাযোগ

প্রতিটি ভ্যাট কমিশনারেটে ঝুলে থাকা পুরোনো ফাইল ও মামলাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা এবং এই সুবিধার কথা তাঁদের জানানো উচিত।

৩. সহযোগিতা সেল চালু

ভ্যাট অফিসে এসে ব্যবসায়ীরা যেন বকেয়া করের হিসাব মেলাতে কোনো ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য প্রতিটি কমিশনারেটে উল্লিখিত মামলা বা বকেয়া ইস্যু দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ সহায়তাকেন্দ্র বা হেল্প ডেস্ক চালু করা প্রয়োজন।

একটি সময়াবদ্ধ সুযোগকে সফল করতে হলে নিয়ম যেমন সহজ ও স্পষ্ট হতে হয়, তেমনি করদাতাদের আস্থায় নেওয়াটাও জরুরি। ৩১ ডিসেম্বরের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই এনবিআর যদি স্পষ্ট পথ বাতলে দিয়ে ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে, তবেই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটবে এবং সরকারের ঘরে জমা হবে হাজার কোটি টাকার বকেয়া রাজস্ব।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস