বাংলাদেশে হিরোর কার্যক্রমের ১২ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই বাজার কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এক্সপালস ২০০ সিরিজকে আপনারা কেন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু কৌশলগত বাজার হিসেবে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের বৈশ্বিক পরিচয় ও শিল্পভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গত ১২ বছরে নিলয় মোটরসের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে স্থানীয় উৎপাদন, বিক্রি ও সেবা নিয়ে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছি। এখানে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১২শ মানুষ কাজ করছে। আমরা ১০ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রির মাইলফলকও অতিক্রম করেছি। এক্সপালস ২০০ সিরিজ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের রাইডারদের চাহিদা এখন আর শুধু দৈনন্দিন যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভ্রমণ ও অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়ের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।
অ্যাডভেঞ্চার মোটরসাইকেলের জন্য বাংলাদেশের বাজার কি প্রস্তুত?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: আমরা বিশ্বাস করি, বাজার প্রস্তুত। তরুণদের কাছে মোটরসাইকেল এখন আর শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি তাদের জীবনধারা, স্বাধীনতা ও ভ্রমণেরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে। এক্সপালস ২০০ ৪ভি ও ৪ভি প্রো এমন রাইডারদের জন্য তৈরি, যাঁরা দৈনন্দিন যাতায়াতের পাশাপাশি ট্রেইল ও অফ-রোড রাইডিংয়েও মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে চান। মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের চাহিদাও তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে ১০ শতাংশের বেশি গ্রাহক এই সেগমেন্টে বা অংশে রয়েছেন।
ছোট শহর ও মফস্সলে ডিলার ও সার্ভিস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো আমাদের অগ্রাধিকার। বর্তমানে নিলয় মোটরসের মাধ্যমে দেশজুড়ে আমাদের ৫০০টির বেশি ‘টাচপয়েন্ট’ রয়েছে। আমরা বড় শহরের বাইরে এই নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করতে চাই। নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা ও বিক্রয়োত্তর সেবাকেও আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিই। এ কারণে পর্যাপ্ত খুচরা যন্ত্রাংশের মজুত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের বাজার নিয়ে হিরোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি। বাজারের চাহিদা ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা আমাদের পণ্যের পোর্টফোলিও আরও সমৃদ্ধ করতে থাকব। এফওয়াই২৬-এ আমাদের সামগ্রিক বাজার অংশীদারত্ব ২১ শতাংশ, যা একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এইচএফ ডিলাক্স ও স্পেলেন্ডর+ এর মতো বিশ্বস্ত মডেলের মাধ্যমে এন্ট্রি-লেভেল সেগমেন্টে আমাদের বাজার অংশীদারত্ব ৫৪ শতাংশের বেশি। এক্সট্রিম ১২৫–এর নেতৃত্বে ১২৫ সিসি সেগমেন্টে ৩০ শতাংশ এবং স্কুটার সেগমেন্টে ৪৫ শতাংশের বেশি। রাইডারদের নিরাপত্তা, আরাম ও সুবিধা বাড়ায়—এমন নতুন ফিচার যুক্ত করে আমরা এই অবস্থান ধরে রাখতে চাই। পাশাপাশি প্রিমিয়াম সেগমেন্টে নতুন মডেল আনতে এবং বিদ্যমান পোর্টফোলিওকে আরও নতুনভাবে সাজাতে চাই। সেই সঙ্গে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও স্কুটারের সম্ভাবনাও মূল্যায়ন করছি। এর সঙ্গে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
হিরোর বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বাংলাদেশে আনা পণ্যগুলোর ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: ভারত ও জার্মানিতে আমাদের গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্র রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বাজার থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা সেখানে পণ্য উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হয়। ‘ডাকার র্যালি’র মতো চ্যালেঞ্জিং মোটরস্পোর্ট প্রতিযোগিতা থেকেও আমরা শিখি, যেখানে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি ভূখণ্ডে প্রতিযোগিতা হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে দৈনন্দিন ব্যবহারকারীদের জন্য আরও শক্তিশালী, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য মোটরসাইকেল তৈরি করা হয়।
মোটরসাইকেল বিক্রির বাইরে গিয়ে কমিউনিটি গড়ে তোলার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের গ্রাহকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ‘হিরোর দেশ’ বলতে কী বোঝায়?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: ‘হিরোর দেশ’ শুধু একটি ক্যাম্পেইনের নাম নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিফলন। আমরা চাই, গ্রাহকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন শুধু মোটরসাইকেল কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাইডারদের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ ও রাইডিং সংস্কৃতির সঙ্গে হিরোকে যুক্ত রাখতে চাই। এখানে অনেক তরুণ গ্রাহক রয়েছেন। আমরা চাই তাঁদের প্রত্যেকে নিজেদের একজন ‘হিরো’ মনে করুন, কারণ তাঁরাও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
কমিউটার মোটরসাইকেলের পাশাপাশি প্রিমিয়াম ও অ্যাডভেঞ্চার সেগমেন্টে আপনারা কীভাবে এগোতে চান?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: কমিউটার সেগমেন্টে হিরোর শক্ত ভিত রয়েছে এবং গ্রাহকদের দৃঢ় আস্থা আছে। তবে গ্রাহকদের চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই কমিউটার মোটরসাইকেলের পাশাপাশি প্রিমিয়াম, স্পোর্টস ও অ্যাডভেঞ্চার সেগমেন্টে নতুন পণ্য আনার সুযোগ আমরা দেখছি। এক্সপালস ২০০ সিরিজ সেই কৌশলেরই একটি অংশ।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে স্থানীয় উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
হর্ষবর্ধন চিত্লে: বাংলাদেশে আমাদের কৌশলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো স্থানীয় উৎপাদন। আমদানিনির্ভরতার বদলে আমরা স্থানীয় উৎপাদন এবং স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ সংগ্রহে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এতে কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সাপ্লাই চেইনের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। তাই স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা বাংলাদেশে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ধন্যবাদ।
হর্ষবর্ধন চিত্লে: আপনাকেও ধন্যবাদ।