সময়মতো প্রকল্প হস্তান্তর করা ক্রেতা ও নির্মাতা উভয়ের লাভ 

স্থপতি মোহাম্মদ আবদুর রহমান, অতিরিক্ত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স

প্রথম আলো: নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসইএল কোন বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মেনে চলছে? নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তরের আপনাদের নীতি কী?

আবদুর রহমান: প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমরা দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই—গুণগত মান ও প্রতিশ্রুতি। আমরা নকশাগত সৌন্দর্যের চেয়ে ভবনের অবকাঠামোগত নিরাপত্তাকে আগে প্রাধান্য দিই; কারণ, জীবনের সুরক্ষায় কোনো আপস হতে পারে না। পাশাপাশি মানসম্মত ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং ও অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তর আমাদের ব্যবসার মূল ভিত্তি। সময়মতো ফ্ল্যাট না পেলে ক্রেতা বা জমির মালিক আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে কাজ করি; তাই বিলম্ব হলে আমাদেরও লোকসান হয়। সময়মতো হস্তান্তরের এই নীতি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক।

প্রথম আলো: ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে ফ্ল্যাট কেনা কঠিন। সাধারণ মানুষের জন্য কী ধরনের সরকারি নীতি প্রয়োজন?

আবদুর রহমান: আবাসন একটি মৌলিক চাহিদা। প্রথমত, সরকার নিজে ২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি ঋণসুবিধাসহ সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সুদের হার সহনীয় করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের নীতিগত সহায়তা পেলে মধ্যবিত্তের জন্য ফ্ল্যাট কেনা সহজ হবে।

প্রথম আলো: ভূমিকম্প–সহনশীল ভবন নির্মাণে আপনাদের নজর কতটা?

আবদুর রহমান: ভূমিকম্প–সহনশীলতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও উন্নত মানের নির্মাণসামগ্রীর সঠিক সমন্বয়। ডিজাইন দুর্বল হলে ভালো মালামাল ব্যবহার করেও লাভ হয় না। আমরা ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে ভালো নকশা ও উপকরণ ব্যবহার করি। এ ছাড়া ভবনের ভেতরে নিরাপদ স্থান রাখা এবং বিপদের সময় দ্রুত বের হওয়ার পথ সুনির্দিষ্ট রাখাও আমরা নিশ্চিত করি।

প্রথম আলো: জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও উপযোগ সেবার চাপ—ঢাকার ভবিষ্যৎ আবাসনে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কী প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

আবদুর রহমান: জলাবদ্ধতা নিরসনে বিধিমালা অনুযায়ী প্লটের একটি অংশ উন্মুক্ত রাখা জরুরি, যাতে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হতে পারে। আমরা বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়ে পরিবেশকে প্রাধান্য দিয়ে অনেক প্রকল্পে অতিরিক্ত পার্কিং না করে মাটি উন্মুক্ত রাখি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন করছি। ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভবন এমনভাবে নকশা করি, যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পেলে এসির নির্ভরতা কমে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব ও তাপপ্রতিরোধী ব্লক ব্যবহার করছি।

প্রথম আলো: বর্তমানে আপনারা কোন শ্রেণির মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করছেন এবং ক্রেতাদের চাহিদায় কী পরিবর্তন দেখছেন?

আবদুর রহমান: একক পরিবার বাড়ায় এখন মানুষ কম রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য ও কম্প্যাক্ট (৯০০-১২০০ বর্গফুট) ফ্ল্যাট পছন্দ করছেন। ক্রেতারা এখন ওপেন কিচেন, ফ্লেক্সিবল ফার্নিচার এবং ভবনের ভেতরে জিম, রানিং ট্র্যাক ও কমিউনিটি স্পেসের মতো যৌথ সুবিধা চান। আমরা এসব আধুনিক চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে ফ্ল্যাট নির্মাণ করছি।

প্রথম আলো: নির্মাণসামগ্রীর উচ্চ মূল্যের কারণে ফ্ল্যাটের দাম স্থিতিশীল রাখা কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে? বিক্রির ওপর কী প্রভাব পড়ছে?

আবদুর রহমান: মালামালের দাম ১০০ টাকা বাড়লে ফ্ল্যাটের দামে প্রভাব পড়ে ২০০ টাকা; কারণ, জমির মালিকের অংশও ডেভেলপারকে তৈরি করতে হয়। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় ফ্ল্যাটের দাম ক্রেতার নাগালের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা বিক্রয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রথম আলো: সামনের দিনে আপনারা ক্রেতাদের জন্য কী ধরনের প্রকল্প নিয়ে আসছেন?

আবদুর রহমান: আমরা পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন বিল্ডিং’ তৈরিতে জোর দিচ্ছি। আইএফসির ‘এজ’ (ইডিজিই) সার্টিফায়েড আবাসন প্রকল্পসহ স্মার্ট প্রযুক্তি, সেন্সর লাইট ও বর্জ্য শোধনব্যবস্থার সমন্বয়ে নতুন প্রকল্প নিয়ে আসছি।