সাক্ষাৎকার

রংপুরে শিল্পের বিকাশে বড় বাধা অর্থায়ন ও জ্বালানিসংকট

রংপুরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। এতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হলেও অর্থায়ন, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়ের সংকটে শিল্প খাত পিছিয়ে আছে। এ অঞ্চলের ব্যবসা–বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদুল হক। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর রংপুর প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন।

প্রথম আলো:

রংপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল খাত কোনগুলো?

এমদাদুল হক: রংপুরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হলো কৃষি ও কৃষিনির্ভর বিভিন্ন খাত। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি ও তামাকের মতো কৃষিপণ্যের উৎপাদন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক ব্যবসারও প্রসার ঘটছে। রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শতরঞ্জির কথা উল্লেখ করা যায়। বিদেশেও এর বাজার আছে। এ ছাড়া চাল, সার, কীটনাশক, পাট, ভোজ্যতেল, কৃষি যন্ত্রপাতি ও তামাকের পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও আর্থিক সেবা খাতের প্রসার ঘটছে।

প্রথম আলো:

বর্তমানে রংপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি কেমন?

এমদাদুল হক: রংপুরের যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি, ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা ও নানা দুর্বলতার কারণে ব্যবসায়ীরা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন।

প্রথম আলো:

উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যাগুলো কী?

এমদাদুল হক: প্রথমত, অর্থায়নের সংকট। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কঠিন শর্ত ও ঋণ বিতরণে জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ধীরগতি রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, ১৯৭৮–৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর বিসিক শিল্পনগরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নিরাপত্তার ঘাটতি এবং জায়গার সংকট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় একটি বিসিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন উদ্যোক্তারা। চতুর্থত, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।

প্রথম আলো:

জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অর্থায়ন সমস্যায় শিল্প কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

এমদাদুল হক: নানা সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আমাদের হিসাবে, ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানা আংশিক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। আর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় রয়েছে।

রংপুরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কিছু শিল্প ইউনিটসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া অটো রাইস মিল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য প্যাকেজিং কারখানা ও হিমাগার আছে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মধ্যে শতরঞ্জি, হস্তশিল্প, বেকারি, আটা-ময়দার মিল ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য উৎপাদনের মতো শিল্প উল্লেখযোগ্য। খেলাপি ঋণ, লোকসান ও ব্যবসায়িক সংকটের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

প্রথম আলো:

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণের অবস্থা কী?

এমদাদুল হক: এ অঞ্চলে আলু, ভুট্টা, ধান, আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। তবে সেই তুলনায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে চালকল, কিছু হিমাগার ও অল্পসংখ্যক পাটকল রয়েছে।

রংপুরে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে আমরা ১০ বছরের কর অবকাশ এবং শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছি।

প্রথম আলো:

রংপুর বিভাগে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। এগুলো বাস্তবায়নে আপনাদের পরামর্শ কী?

এমদাদুল হক: আমাদের প্রস্তাব, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত প্রস্তুত করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিষেবা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবেন। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে চালু হলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রথম আলো:

নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা কোন কোন খাতে এগিয়ে আসছেন?

এমদাদুল হক: রংপুর অঞ্চলে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাঁরা মূলত হস্তশিল্প, শতরঞ্জি, বুটিকস, ই-কমার্স, ক্যাটারিং, রেস্তোরাঁ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতে কাজ করছেন। এসব উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।