ইউরোপে অবিক্রীত পোশাক ধ্বংসে নিষেধাজ্ঞা, বাংলাদেশের সামনে সংকট নাকি সম্ভাবনা
বিশ্ব ফ্যাশন বাজারে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেও পড়ছে। স্থায়িত্ব বা পরিবেশবান্ধব নীতি এখন আর শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিয়েছে আইনি বাধ্যবাধকতায়। এর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চালু করেছে ‘টেকসই পণ্যের পরিবেশবান্ধব নকশা বিধিমালা’। এই কাঠামোর অধীনে অবিক্রীত পোশাক, পোশাকের অনুষঙ্গ ও জুতা ধ্বংস বা পুড়িয়ে ফেলার ওপর উল্লেখযোগ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যে খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, সেই পোশাকশিল্পের জন্য এই নিয়ন্ত্রণ শুধু পরিবেশগত নীতি নয়; বরং এটি আগামী দিনের ব্যবসায়িক মডেল বদলেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সময়মতো বিষয়টি বুঝে প্রস্তুতি নিতে পারলে এটি ঝুঁকির বদলে সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার কারণ পাহাড়সমান অপচয়
ইইউর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইউরোপে প্রতিবছর বাজারে আসা মোট পোশাকের ৪ থেকে ৯ শতাংশ বিক্রি হওয়ার আগেই ধ্বংস করে ফেলা হয়। এর কারণে প্রতিবছর বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৫৬ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা ২০২১ সালে পুরো সুইডেনের বার্ষিক নিট নির্গমনের সমান।
এই ক্ষতি ঠেকাতে গত ১৯ জুলাই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অবিক্রীত পণ্য ধ্বংসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ২৫০ জনের বেশি কর্মী এবং বার্ষিক লেনদেন অন্তত ৫ কোটি ইউরো, তারা আর ফেরত আসা বা অবিক্রীত পোশাক ফেলনা হিসেবে ফেলে দিতে বা পোড়াতে পারবে না। ২০৩০ সাল থেকে মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোও এই আইনের আওতায় আসবে। তবে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত বিধিনিষেধের বাইরে থাকছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পণ্য ধ্বংসের আগে কোম্পানিগুলোকে তিনটি বিকল্প বেছে নিতে হবে—
১. মূল্যছাড় দিয়ে বিক্রি করা; ২. দাতব্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দান করা; এবং ৩. মেরামত বা সংস্কার করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাঝুঁকি, আইনি অসামঞ্জস্য, মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন বা মারাত্মক ত্রুটির মতো বিশেষ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পণ্য ধ্বংস করা যাবে না। আর এসব ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত নথিপত্র সংরক্ষণ, ৩০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা এবং বার্ষিক প্রকাশ্য প্রতিবেদনে বর্জ্যের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
বাজার কিছুটা মন্দা
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। যদিও ২০২৫ সালের ইইউর পোশাক আমদানি বেড়েছিল ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তার মানে, চলতি বছর বাজার কিছুটা মন্দা। জ্বালানির উচ্চ মূল্যের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া অন্যান্য পণ্যের চাহিদা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি মজুত পণ্য বেড়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাক আমদানি কমিয়েছে ইইউর ক্রেতারা।
চলতি বছরের ছয় মাসে ইইউতে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অথচ গত বছর এই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। ফলে বাজারটিতে বাংলাদেশের হিস্যা ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমেছে।
যদিও মন্দার প্রভাব কয়েকটি দেশের ওপর কম পড়েছে। বাজার সংকুচিত হলেও ভিয়েতনামের অংশীদারত্ব বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের রপ্তানি বেড়েছে দশমিক ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে চীনের রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
বাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তন
অবিক্রীত পণ্য সহজে বাতিল বা ধ্বংস করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় ইইউর ব্র্যান্ডগুলো কেনাকাটার কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে।
• কাছাকাছি দেশ থেকে সরবরাহ: নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে উৎপাদন অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে ব্র্যান্ডগুলো।
• মান ও পরিপালন ব্যবস্থার ওপর জোর: অনলাইনে পণ্য ফেরতের হার কমাতে এবং অবিক্রীত পণ্যের ঝুঁকি এড়াতে মান নিয়ন্ত্রণ ও গতিপথ অনুসরণে জোর দেওয়া হবে।
• ছোট চালানে দ্রুত সরবরাহ: দীর্ঘমেয়াদি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বড় অর্ডারের বদলে দ্রুত সরবরাহযোগ্য ছোট চালানের দিকে ঝুঁকবে ব্র্যান্ডগুলো।
প্রথাগতভাবে বড় পরিসরে এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে পণ্য সরবরাহে অভ্যস্ত বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য এসব পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এটি ব্যবসা ঢেলে সাজানোর একটি নতুন সুযোগও তৈরি করছে।
বাংলাদেশের করণীয় কী রয়েছে
আগামীর দিনগুলোতে ক্রেতাদের কাছে পুনর্ব্যবহার ও স্বচ্ছতাই হবে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এই নতুন বাস্তবতায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প মালিকেরা যেসব পদক্ষেপ নিতে পারে—
• দ্রুত ও চাহিদামাফিক উৎপাদন: অনুমানের ওপর ভিত্তি করে উৎপাদনের বদলে বাজারের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী ছোট চালানে উৎপাদন ও দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা।
• ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা: ‘ডিজিটাল পণ্য পরিচয়পত্র’ পূরণে কাঁচামালের উৎস, রাসায়নিক উপাদান ও পণ্যের জীবনচক্র অনুসরণের মতো ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করা।
• পণ্যের মানোন্নয়ন: উৎপাদন ত্রুটি ও অনলাইন রিটার্ন কমাতে মানদণ্ড আরও উন্নত করা, যাতে অবিক্রীত পণ্য সহজেই বিকল্প প্রক্রিয়ায় নতুন রূপ পেতে পারে।
• পুনঃচক্রায়নভিত্তিক অর্থনীতি: কারখানায় সম্পদসাশ্রয়ী ও টেকসই কার্যক্রম বৃদ্ধি করা।
প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিপালন নীতি মেনে চলা এবং স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে আগামী দিনেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
লেখক: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক।