বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কাজুইকি কাতাওকা: আমি বাংলাদেশে এসেছি ২০২৫ সালের জুনে। এটি খুব সংক্ষিপ্ত সময়। তবে গত এক বছর দুই মাসেই এখানকার পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হতে দেখেছি। ব্যবসা ও অর্থনীতির দিক থেকে বলতে গেলে মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা। রাজনৈতিক দিকে থেকে বলতে গেলে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কারণে পরিবেশ উন্নত হয়েছে। এতে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে ভালো উদ্দীপনা পাচ্ছেন। নির্বাচনের পরে বেশ কিছু জাপানি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বাংলাদেশে আসছেন। এ কারণে জাপান থেকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ নিয়ে আসার জন্য জেট্রোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
কাজুইকি কাতাওকা: তিনটি প্রধান বিষয় জাপানি কোম্পানিগুলোকে ভোগাচ্ছে, যা সরকারের সমাধান করা প্রয়োজন। প্রথমটি শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, দ্বিতীয়টি মূলধন ও মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। আর শেষটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (ইন্টিলেকচুয়াল প্রোপার্টি) নিয়ে সমস্যা। একই সঙ্গে দুর্নীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমার মনে হয়, দুর্নীতি দূর করা বেশ কঠিন। কারণ, এটি একধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।
শুল্কায়ন–জটিলতার ক্ষেত্রে দেখা যায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ইনভয়েস বা চালান মূল্যের ওপর ভিত্তি করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু এই দেশে কিছু কোম্পানি আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম মূল্য দেখানো) করে। তাই কাস্টমস ইনভয়েস মূল্যকে বিশ্বাস করতে পারে না। ফলে আমাদের বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প যেটাই হোক, জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য মুনাফা ফেরত পাঠানো খুবই কঠিন। মাঝেমধ্যে টাকা পাঠানোর জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হয়। এ জন্য আমাদের কখনো বিডাতে, কখনো এনবিআরে, আবার কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকে দৌড়াতে হয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সরকার হয়তো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষায় খুব একটা আগ্রহী নয়। কারণ, এখানে প্রচুর নকল পণ্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে সিটিজেন ক্যালকুলেটর, ওমরনের কথা বলা যায়। নকল পণ্যের কারণে তারা বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।
এখানে শ্রমের খরচ হয়তো কম হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি পরিষেবা মূল্য বা জমি অধিগ্রহণ খরচের মতো অন্য বিষয়গুলো দেখেন, তবে কিন্তু তা মোটেই কম নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি মিয়ানমার বা শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি।
প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমের খরচ কম। এটিকে অনেকে সুবিধাজনক বিষয় হিসেবে দেখেন। আপনারা কী মনে করেন?
কাজুইকি কাতাওকা: এখানে শ্রমের খরচ হয়তো কম হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি পরিষেবা মূল্য (ইউটিলিটি ফি) বা জমি অধিগ্রহণ খরচের মতো অন্য বিষয়গুলো দেখেন, তবে কিন্তু তা মোটেই কম নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি মিয়ানমার বা শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি। এ ছাড়া সরকারি প্রক্রিয়ার বিলম্ব বা অস্পষ্টতার জন্য অতিরিক্ত খরচ হয়। ফলে এখানে ব্যবসা করার সামগ্রিক খরচ অন্য দেশের তুলনায় কম নয়। এ দেশের ব্যবসার পরিবেশকে আকর্ষণীয় করতে হলে শুধু শ্রমের খরচে মনোযোগ না দিয়ে মোট খরচের দিকে তাকাতে হবে। বিশেষ করে অহেতুক খরচ কমাতে হবে।
নতুন সরকার কিছু নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করা হচ্ছে। আপনারা এই উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?
কাজুইকি কাতাওকা: আসলে এটি আমাদেরই প্রস্তাব ছিল (বিনিয়োগ সংস্থাগুলো একীভূত করা)। জাপানে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য একটিমাত্র মন্ত্রণালয় কাজ করে। তাই আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কিছু সুপারিশ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে এটিও ছিল।
তাহলে আপনারা এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন?
কাজুইকি কাতাওকা: কিছু দিক ইতিবাচক, আবার কিছু দিক ইতিবাচক না–ও হতে পারে। ইতিবাচক দিক হলো সরকারের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার সদিচ্ছা রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে বিডা, বেজা ও পিপিপি কার্যালয়কে একীভূত করা হচ্ছে। তবে এটা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা দেখতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে, সরকার বিনিয়োগ–সম্পর্কিত সব সংস্থাকে একীভূত করতে পারেনি। বেপজা ও হাই-টেক পার্ক এখনো আলাদা রয়েছে। আবার যে তিনটি সংস্থাকে একত্র করা হচ্ছে, তাদের ভূমিকা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
আরেকটি বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রণ শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া হলেও যে মানুষগুলো তা বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদের মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তাদের ইতিবাচক মনোভাব, বিশেষ করে মধ্য ও নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোভাব এবং তাদের জবাবদিহি অত্যন্ত জরুরি। কারণ, আমরা এমন অনেক ঘটনা দেখি যেখানে অহেতুক নানা হয়রানি করা হয়।
নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশে ৩৫০টির মতো জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা কতটা বাড়তে পারে?
কাজুইকি কাতাওকা: নিশ্চিতভাবে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। কারণ, বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর কাজের ধরন ও কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে। প্রথাগতভাবে, অনেক জাপানি কোম্পানি মূলত এখানে পণ্য উৎপাদন করে অন্য দেশে রপ্তানি করত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার লক্ষ্য করে ব্যবসা করতে আসছে। এটি খুবই নতুন প্রবণতা। অভ্যন্তরীণ বাজারের দিক থেকে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য দুটি আকর্ষণীয় খাত রয়েছে। একটি হলো খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যটি নিত্যব্যবহার্য পণ্য (এফএমসিজি)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মিতসুই কোম্পানি এসিআই লজিস্টিকসে (স্বপ্ন) বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এপ্রিলে মিতসুবিশি করপোরেশন র্যানকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। উভয় বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার।
জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নকাজ শেষ; তবে এখনো সেখানে অনেক জমি খালি পড়ে রয়েছে কেন?
কাজুইকি কাতাওকা: এটিই একমাত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল, যা জাতীয় মানদণ্ডগুলো পূরণ করে। ইতিমধ্যে সিঙ্গারসহ একাধিক কোম্পানি সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। আরও কয়েকটি কোম্পানির কারখানা নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে সব মিলিয়ে তা ১০টির কম। এর বাইরে কিছু কোম্পানি জমি নিলেও কাজ শুরু করেনি; তারা পর্যবেক্ষণ করছে। আর কিছু কোম্পানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিয়োগ কম আসার পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্কও রয়েছে। অবশ্য গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক জাপানি কোম্পানি এসে পরিস্থিতি দেখছে এবং বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করছে।
আরেকটি বিষয় হলো, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলেও বিদ্যুৎ–গ্যাস এবং খরচের ব্যাপারে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের গুরুত্ব কেমন দেখছেন?
কাজুইকি কাতাওকা: বিষয়টি কিছুটা রাজনৈতিক, তবে আমি উল্লেখ করতে চাই। ভারতের সঙ্গে যদি আমরা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করতে পারি, তবে আমাদের পাশেই একটি বিশাল বাজার রয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে সেভেন সিস্টার্সে রপ্তানি করতে পারে। আমি জানি এটি বেশ কঠিন, তবে এই সম্ভাবনাগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত। বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র (হাব) হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আপনি কীভাবে দেখেন?
কাজুইকি কাতাওকা: আগামী ৫-১০ বছরে এ দেশে জাপানি কোম্পানির ব্যবসা আরও বহুমুখী হওয়া উচিত। বর্তমানে শিল্প খাতও অনেক বহুমুখী হচ্ছে। যেমন, জাপানি কোম্পানি লায়ন ডিটারজেন্ট, টুথপেস্ট ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবসা করছে। এখন জাপান থেকে আমদানি করা অন্যতম প্রধান পণ্য হলো ইস্পাত। ইপিএ চুক্তির কারণে শুল্কের হার ধীরে ধীরে কমছে, ফলে আগামী ৫-১০ বছরে ইস্পাত আমদানি আরও বাড়বে। এ ছাড়া আমি কৃষিসহ অন্যান্য খাতের সম্ভাবনাও দেখছি। বাংলাদেশে ধনী পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা চাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষ জাপানের উচ্চমানের পণ্য ব্যবহার করুক। তাই শুধু টেক্সটাইল বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ নয়; কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুই দেশ একে অপরকে সহায়তা করতে পারে।