নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থায় নেওয়া দরকার
নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। গতকাল শপথ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পরবর্তী সময়ে দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে অর্থনীতি ছিল মূলত স্থবির। বিনিয়োগেও আশাজাগানিয়া কোনো সুখবর ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সবখানেই ছিল একধরনের স্থবির অবস্থা। এ কারণে নির্বাচিত সরকারের কাছে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিষয়ে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও করণীয় বিষয়ে কথা বলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন ব্যবসায়ী ।
দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পার করে গ্রহণযোগ্য এক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। বাস্তবে ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়নি। খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছিল। বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থানও বাড়েনি। ফলে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি। সেই অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে দাঁড় করানো খুব সহজ নয়। তবে নতুন সরকার আসায় আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক। প্রধানমন্ত্রী চাঁদাবাজি কঠোরভাবে দমনের কথা বলেছেন—এটি ইতিবাচক এক বার্তা। নতুন সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে এমন আরও পদক্ষেপ নেবে—একজন উদ্যোক্তা হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
বেসরকারি খাতের উন্নয়নে চারটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সেগুলো হলো বাণিজ্য, অর্থ ও পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং নৌপরিবহন। এই চার খাতের দায়িত্ব চারটি মন্ত্রণালয়ের হাতে। প্রথমত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অসম বা অকার্যকর চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসক দিয়ে চলছে। তাই সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্ব ব্যবসায়ীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া দরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনেক কাজ করার আছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদহার। বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। অথচ বিশ্বে ব্যাংকঋণের সুদহার ৩ থেকে ৪ শতাংশ। সুদহার এক অঙ্কে না নামলে নতুন বিনিয়োগ হবে না, আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। একই সঙ্গে পণ্য খালাস দ্রুত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা চালু রেখে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় এক দিনে শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করা গেলে তাতে ব্যবসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত ব্যক্তি খাতনির্ভর। ব্যক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।... অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো দরকার। তেল পরিশোধনাগার শুধু সরকারি খাতে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল আছে; আরও দুটি স্থাপনের উদ্যোগ এখনই নিতে হবে; কারণ, পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত অন্তত দুই বছর সময় লাগে।
নৌপরিবহন খাতও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগে বন্দর সম্প্রসারণ এগিয়ে নিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বন্দর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নদীবন্দর উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতে নতুন ঘাট নির্মাণের সুযোগ দেওয়া গেলে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং বাণিজ্যে গতি আসবে।
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত ব্যক্তি খাতনির্ভর। ব্যক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সে জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং উৎপাদনমুখী খাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে। বর্তমানে একটি কোম্পানিকে বছরে ২৬ থেকে ৩৮টি লাইসেন্স নিতে হয়, যেগুলোর অনেকগুলো আবার নিয়মিত নবায়ন করতে হয়। একটি সমন্বিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে, যাতে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হয়।
সবশেষে দুটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, আমদানি করা কাঁচামালের শুল্কায়ন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা; দ্বিতীয়ত, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ।
নতুন সরকারের সামনে অনেক কাজ। বিনিয়োগ বাড়ানো বা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে, যেসব প্রত্যাশার কথা বললাম সেগুলো খুব দ্রুত হবে না। তবে সরকার চাইলে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারে। তাতে ধাপে ধাপে সুফল পাওয়া যাবে। সবশেষে বলা দরকার, আগে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থায় নেওয়া দরকার। দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করলে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে। আর বেসরকারি খাত বিনিয়োগে এগিয়ে এলে অর্থনীতিও গতি পাবে।
আমিরুল হক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সীকম গ্রুপ; সভাপতি, বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি ও এলপিজি অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন