দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ব্যক্তি খাতকে অংশীদার করলে অগ্রগতি দ্রুত হবে
বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। জ্বালানিকে এখন শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সরাসরি আমাদের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই জ্বালানিসংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হলে সরকার ও ব্যক্তি খাতকে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারির শেষে দেশের গ্রিডভিত্তিক স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। ক্যাপটিভ ও অফ গ্রিড সক্ষমতা যোগ করলে মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
অথচ বিপিডিবির হিসাবে গত বছর সর্বোচ্চ চাহিদা পূরণের রেকর্ড ছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ আমাদের সমস্যাটি শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত সক্ষমতার ঘাটতি নয়; বরং সেই সক্ষমতাকে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ীভাবে কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি বছরের জুলাইয়ের বিপিডিবির তথ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ৪৪ শতাংশই গ্যাসভিত্তিক, প্রায় ২৪ শতাংশ কয়লাভিত্তিক এবং ২৩ শতাংশের বেশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুতের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং বায়ুবিদ্যুতের অংশ শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ। ফলে আমাদের বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
এ নির্ভরতার অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তেল ও কয়লার মূল্য বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর পড়ে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে শিল্পে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া বা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সবকিছু শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এটি বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগীদের সঙ্গে খুব সামান্য মূল্য ব্যবধানে প্রতিযোগিতা করতে হয়।
এ বাস্তবতায় আমি মনে করি, সরকারকে ব্যক্তি খাতকে জ্বালানি খাতে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসতে আহ্বান জানাতে হবে। তবে শুধু আহ্বান যথেষ্ট নয়, এর জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, অর্থায়ন, দ্রুত অনুমোদন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা দিতে হবে। সুখের বিষয় হলো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা, ২০২৫-এ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ব্যক্তি খাতকে কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর নীতি, ২০২৫ গ্রহণ করেছে। এটি সঠিক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন নীতিকে দ্রুত বাস্তব বিনিয়োগে রূপান্তর করাই প্রধান কাজ।
বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জমির স্বল্পতা রয়েছে। বৃহৎ সোলার পার্কের জন্য বিপুল জমি ব্যবহারের পরিবর্তে শিল্পকারখানা, গুদাম, বাণিজ্যিক ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনার অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।
আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। আমরা রুফটপ সোলারে বিনিয়োগ করেছি। এর মাধ্যমে আমাদের প্রতিষ্ঠানের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করেছি। আমি মনে করি, দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজস্ব চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এভাবে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে তার সম্মিলিত প্রভাব জাতীয় পর্যায়ে অনেক বড় হতে পারে।
ইতিমধ্যে এর একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) গত মার্চের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬টি বিদ্যুৎ বিতরণ ইউটিলিটির আওতায় ৪ হাজার ৪৯০টির বেশি নেট মিটারড রুফটপ সোলার সিস্টেম সংযুক্ত হয়েছে, যার মোট সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় একজন গ্রাহক নিজের নবায়নযোগ্য উৎসে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন।
তবে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের কথা বিবেচনা করলে ২১৪ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার আমাদের সম্ভাবনার তুলনায় এখনো খুবই ছোট। এটিকে কয়েক গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে ২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকা এবং জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এখন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যবসাবান্ধব করা প্রয়োজন।
আমি মনে করি, এখানে অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রুফটপ সোলার বা অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের শুরুতেই উল্লেখযোগ্য মূলধন প্রয়োজন, যদিও দীর্ঘ মেয়াদে এটির অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদের অর্থায়ন আরও সহজলভ্য করা দরকার। একই সঙ্গে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কর ও শুল্ককাঠামো এমন হওয়া উচিত, যাতে বিনিয়োগ আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় হয়।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নীতির ধারাবাহিকতা। একজন উদ্যোক্তা যখন একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা জ্বালানি প্রকল্পে শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি এক বা দুই বছরের জন্য পরিকল্পনা করেন না। তাঁকে ১০ থেকে ১৫ বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যনীতি, করকাঠামো, নেট মিটারিং, গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের নিয়ম সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকা জরুরি।
আমাদের জ্বালানিসংকটের কোনো একক সমাধান নেই। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে সৌর, বায়ু, বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও ভবিষ্যতে ব্যাটারি স্টোরেজসহ নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিল্প খাতকে শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের গ্রাহক হিসেবে দেখলে হবে না; শিল্প খাতকে জ্বালানি সমাধানের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
সরকার যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, সহজ অর্থায়ন, দ্রুত অনুমোদন এবং বিনিয়োগের যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করে, তাহলে বাংলাদেশের ব্যক্তি খাত জ্বালানি খাতে আরও বড় বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসবে। সরকার নীতি ও অবকাঠামো দেবে আর ব্যক্তি খাত দেবে মূলধন, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উদ্ভাবন।
আমাদের লক্ষ্য শুধু আজকের জ্বালানিঘাটতি মোকাবিলা করা নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের শিল্পায়নের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে। আর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়বে। তাই এখনই সময় জ্বালানি খাতে ব্যক্তি খাতকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়ার এবং সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার। তাহলেই অগ্রগতি দ্রুত হবে।
লেখক: আসিফ ইব্রাহিম, সাবেক সভাপতি, ঢাকা চেম্বার