বিনিয়োগে আস্থার সংকট কাটানোর পদক্ষেপ চাই

নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। গতকাল শপথ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীসহ নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পরবর্তী সময়ে দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে অর্থনীতি ছিল মূলত স্থবির। বিনিয়োগেও আশাজাগানিয়া কোনো সুখবর ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান সবখানেই ছিল একধরনের স্থবির অবস্থা। এ কারণে নির্বাচিত সরকারের কাছে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা ও করণীয় বিষয়ে কথা বলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন ব্যবসায়ী

তপন চৌধুরীফাইল ছবি

কয়েক বছর ধরে দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছিল। আস্থার সংকটে ভুগছিলেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। নতুন সরকারের কাছে ব্যবসায়ী সমাজ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রথম চাওয়া, আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি ছিল। শুরুতে তারা কিছু উদ্যোগ নিলেও পরে তাদের কিছু কর্মকাণ্ডে মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদেরও আস্থায় চিড় ধরে। এ কারণে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যায়।

নতুন সরকার গতকাল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। একজন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন সরকারের কাছে আমার প্রথম প্রত্যাশা থাকবে, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারা এমন কিছু উদ্যোগ বা ব্যবস্থা নেবে, যাতে উদ্যোক্তাদের হারানো আস্থা ফিরে আসে। আমরা যাঁরা এ দেশে ব্যবসা করতে করতে এই পর্যন্ত এসেছি; তাঁরা জানি, সরকার চাইলেও রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এমন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে উদ্যোক্তাদের মনে হয় সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আন্তরিক।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। সেটির প্রতিফলন সরকারকে শুরুতে দেখাতে হবে। আমরা সরকারের কাছে বেআইনি কোনো সুযোগ-সুবিধা চাই না। আমরা নিয়মনীতির চর্চা দেখতে চাই। আমরা চাই আমলাতন্ত্রের লালফিতার দৌড়ে কোনো সিদ্ধান্ত আটকে থাকবে না। আবার ব্যক্তিভেদে নিয়মকানুনের ব্যত্যয় ঘটবে না।

ব্যবসা-বাণিজ্যকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যাবে না। যাঁরা প্রকৃত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা, তাঁদের কোনো রাজনৈতিক আনুগত্য থাকে না। ব্যবসা ও শিল্পকারখানার প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের সব সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ব্যবসা করতে হয়। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক মানেই দলীয় আনুগত্য নয়।

অতীতে আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ওয়াদা করা হয়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেসব ওয়াদা বাস্তবায়নের উদ্যোগ থেকে অনেক সরকার সরে গেছে। এমনটি আমরা আর দেখতে চাই না। গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, যেন সব অনিয়মের দায় শুধু ব্যবসায়ীদের। এই ধারণা একেবারেই ভুল। নতুন সরকারের উচিত হবে ব্যবসায়ীদের নিয়ে তৈরি হওয়া এই নেতিবাচক মনোভাব দূর করা।

জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তাই জনগণের সমস্যার সমাধানকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

বর্তমানে দেশের শিল্পকারখানা বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকটে ভুগছে। তাতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যে এই সমস্যার সমাধানে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা এ–ও জানি, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান রাতারাতি হবে না। সে জন্য সময় লাগবে। কিন্তু সাময়িকভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করে বা বিকল্প ব্যবস্থায় এই সমস্যার সমাধানের অনেক উপায় আছে। জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তাই জনগণের সমস্যার সমাধানকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এ দেশের উদ্যমী একটি জনগোষ্ঠী যেমন আছে, তেমনি উদ্যোক্তারাও যথেষ্ট উদ্যোগী। এ উদ্যমকে কাজে লাগাতে সরকারের করণীয়, শুধু সমস্যার সমাধান করা। তাহলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাই ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন নতুন শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসবেন। আমাদেরও এই দেশ-জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা বিনিয়োগে আগ্রহী। আর বিনিয়োগ যত বাড়বে, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও তত বাড়বে। এ জন্য সরকারের কাছে আমরা চাই বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নত পরিবেশ। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করার পদক্ষেপ চাই। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি ফেরানোর কোনো বিকল্প নেই।