আজিয়াটা গ্রুপ সিইওর সাক্ষাৎকার

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বড় সম্ভাবনা দেখছে আজিয়াটা

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছে মালয়েশিয়াভিত্তিক আজিয়াটা গ্রুপ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন গ্রুপটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিক রিজাল কামিল। এ সময় তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ, টেলিযোগাযোগ খাতের অবস্থা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈয়দ রিফাত মোসলেম।

প্রথম আলো:

আজিয়াটা বাংলাদেশে ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করছে। এই সময়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?

নিক রিজাল কামিল: আমি ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আজিয়াটার গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। চলতি বছরের জুনে গ্রুপ সিইওর দায়িত্ব নিয়েছি। বাংলাদেশে আজিয়াটার উপস্থিতি দীর্ঘদিনের এবং এই সময়ে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল সংযোগের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। টেলিকম এখন আর শুধু মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনীতি, ব্যবসা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে টেলিকম খাতের গুরুত্বও বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের দিক থেকেও আমরা কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। শিল্প খাতের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টেলিকম খাতেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আমরা লক্ষ করছি। আমাদের দৃষ্টিতে, সরকার ও শিল্প—উভয় পক্ষের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আলো:

আপনি মালয়েশিয়ায়ও কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ব্যবসায়িক পরিবেশের মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?

নিক রিজাল কামিল: দুই বাজারের মধ্যে মৌলিকভাবে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার, জনসংখ্যা, মানুষের ব্যয়ের সক্ষমতা এবং বাজারের পরিপক্বতা এক নয়। ফলে একটি বাজারে যে অভিজ্ঞতা বা ব্যবসায়িক মডেল সফল হয়েছে, সেটি অন্য বাজারে একইভাবে প্রয়োগ করা সব সময় সম্ভব নয়। আজিয়াটা বিভিন্ন দেশে ব্যবসা পরিচালনা করে। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিটি বাজারের নিজস্ব বাস্তবতা, গ্রাহকের চাহিদা ও ব্যবসায়িক পরিবেশকে গভীরভাবে বোঝা এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। একটি দেশে সফল কোনো মডেল অন্য দেশে হুবহু কাজ করবে—এমন প্রত্যাশা আমরা করি না।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশের বাজারে রবির অবস্থান কীভাবে দেখেন?

নিক রিজাল কামিল: রবি বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আজিয়াটার জন্যও তেমনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসা। এটি আমাদের পাঁচটি প্রধান টেলিকম ব্যবসার একটি। আজিয়াটার পোর্টফোলিওর প্রায় ৯০ শতাংশ এই পাঁচটি টেলিকম ব্যবসা থেকে আসে। সেই বিবেচনায় রবি আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আমরা রবিতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছি, বিশেষ করে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে। বাংলাদেশের প্রতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে টেলিকম অবকাঠামোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যবসার পরিবেশ আরও কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব হলে এর সুফল শুধু কোম্পানির জন্য নয়, বৃহত্তর অর্থনীতির জন্যও তৈরি হবে।

প্রথম আলো:

রবি রেকর্ড মুনাফা করলেও এর মুনাফার হার গ্রামীণফোনের চেয়ে কম। এর কারণ কী?

নিক রিজাল কামিল: গ্রামীণফোন ও রবি দুটি ভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাদের ইতিহাস, আকার, বাজারে অবস্থান ও ব্যবসার বিবর্তন ভিন্ন। তাই শুধু একটি সূচকের ভিত্তিতে সরাসরি তুলনা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। আমাদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো রবির ধারাবাহিক অগ্রগতি। রবি বাজারে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, ডেটা ব্যবসায় নেতৃত্ব তৈরি করেছে, মুনাফা বাড়িয়েছে এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য তৈরি করে চলেছে। শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি তুলনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের লক্ষ্য সুশৃঙ্খল কার্যক্রম, যথাযথ কৌশলগত বিনিয়োগ এবং টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে রবির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো।

প্রথম আলো:

রবির গ্রাহকদের কাছ থেকে নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেটের গতি ও সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগকে আপনি কীভাবে দেখেন?

নিক রিজাল কামিল: গ্রাহকের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই হলো গ্রাহকদের আরও উন্নত ও নির্ভরযোগ্য সেবা দেওয়া। কোথায় নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে, কোথায় সেবার মান কমছে—এসব বিষয় নিয়মিত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। রবির ডেটা ব্যবসায় বাজারের শীর্ষস্থানীয় অবস্থান আমাদের আনন্দিত করে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ফোর–জি চালুর সময় থেকেই আমরা লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ করেছি, যার সুফল এখন দেখা যাচ্ছে। ফোর–জি হোক বা ফাইভ–জি, শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাহকের জন্য আরও ভালো গতি, নির্ভরযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা।

প্রথম আলো:

এআই টেলিকম খাতে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে?

নিক রিজাল কামিল: এআই টেলিকম খাতের বিভিন্ন স্তরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো গ্রাহক ব্যবস্থাপনা। গ্রাহকের প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বোঝা, তাদের ধরে রাখা, বিক্রয় কার্যক্রম ও কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনায়ও এর বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কোন এলাকায় সম্ভাব্য সমস্যা তৈরি হতে পারে বা কোথায় সেবার মান কমতে শুরু করেছে—এআইয়ের মাধ্যমে তা আরও আগে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর ভিত্তিতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া গেলে নেটওয়ার্কের অবনতি ঠেকানো, সেবার মান বাড়ানো এবং ‘কস্ট টু সার্ভ’ কমানো সম্ভব হবে।

প্রথম আলো:

টেলিকমের বাইরে আজিয়াটা কি বাংলাদেশে নতুন কোনো ব্যবসায় যেতে আগ্রহী?

নিক রিজাল কামিল: আমরা অবশ্যই নতুন সুযোগ পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আমাদের মূল ব্যবসা এখনো টেলিকম। এটি আমাদের ডিএনএ এবং ভবিষ্যতেও আমাদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। তাই আমরা এমন ব্যবসার প্রতি বেশি আগ্রহী, যেগুলো আমাদের মূল ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং যেখানে আমাদের বিদ্যমান প্রযুক্তি, সক্ষমতা, অবকাঠামো কাজে লাগানো যায়। যদি এমন কোনো প্রযুক্তি ব্যবসায় বিনিয়োগ করি, যার সঙ্গে টেলিকম ব্যবসার কৌশলগত সম্পর্ক নেই, তাহলে সেই বিনিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সে কারণে প্রযুক্তি খাতেও আমরা বেছে বেছে এবং কৌশলগতভাবে বিনিয়োগ করতে চাই।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

নিক রিজাল কামিল: বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে এবং ধীরে ধীরে মানুষকে আরও ডিজিটাল ও ক্যাশলেস আর্থিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে। তবে শুরুতেই বড় বিনিয়োগ করার পরিবর্তে মানুষের প্রকৃত চাহিদা কোথায়, সেটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসাটি ‘সাপ্লাই-লেড’ না হয়ে ‘ডিমান্ড-লেড’ হওয়া উচিত। অর্থাৎ শুধু একটি সেবা তৈরি করে বাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মানুষ আসলে কোন সেবা চায় এবং কোন সমস্যার সমাধান চায়, সেটিকে কেন্দ্র করে এগোতে হবে।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায় দেখছেন?

নিক রিজাল কামিল: বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি। পাশাপাশি এ দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো নগদ অর্থনির্ভর। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম দ্রুত ডিজিটাল সেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে মানুষকে আরও ডিজিটাল ও ক্যাশলেস আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বড় সুযোগ রয়েছে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংকে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না; মানুষ সেটি কীভাবে ব্যবহার করবে এবং তাদের জীবনে কী ধরনের বাস্তব মূল্য তৈরি হবে, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আলো:

রবির বিশাল গ্রাহকভিত্তি কি নতুন ডিজিটাল ব্যবসার ক্ষেত্রে আজিয়াটার জন্য বড় সুবিধা?

নিক রিজাল কামিল: অবশ্যই। নতুন কোনো ব্যবসা যদি রবির বিদ্যমান গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ক্যাশলেস সোসাইটি তৈরির কাজটি ত্বরান্বিত হবে। এ কারণেই আমরা এমন ব্যবসার সুযোগ খুঁজছি, যেগুলো টেলিকমের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আমাদের বিদ্যমান গ্রাহকভিত্তি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোকে কাজে লাগানো যাবে। আমাদের জন্য এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেল বেশি যৌক্তিক।

প্রথম আলো:

সাইবার হুমকি ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। রবি কীভাবে ডেটা গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আস্থা আরও শক্তিশালী করছে?

নিক রিজাল কামিল: ডিজিটাল অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো আস্থা। তাই সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা গোপনীয়তা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও গ্রাহকসেবার নকশা এবং উন্নয়নের শুরু থেকেই এগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আজিয়াটা ও রবি ধারাবাহিকভাবে সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা, সুশাসন–কাঠামো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ করছে। তবে আমরা মনে করি, ডিজিটাল আস্থা তৈরির জন্য শুধু প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা সংস্কৃতি।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশের টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

নিক রিজাল কামিল: বাংলাদেশের বাজার নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। বিশেষ করে স্মার্টফোন ও ফাইভ–জি ডিভাইসের ব্যবহার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। আমরা এটিকে শুধু একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখি না; বরং এর মধ্যে বড় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখি। মানুষের হাতে আরও বেশি স্মার্টফোন পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ডেটা ব্যবহার বাড়বে, ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়বে এবং নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তারা দ্রুত ডিজিটাল সেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে স্মার্টফোন, ডেটা ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার আরও বাড়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।