সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নতুন বেতন দেড় থেকে দুই বছরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে

বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে বিদায়ের সুর।

গতকাল রোববার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তিনি অর্থনীতির প্রায় সব দিক নিয়েই কথা বলেছেন। টেলিফোনে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি ফখরুল ইসলাম

প্রথম আলো:

জাতীয় বেতন কাঠামোর সুপারিশ হলো, বাস্তবায়নের জন্য কমিটিও গঠিত হলো। অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন শেষে এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন দরকার, তবে একবারে নয়। এটা করতে হবে পর্যায়ক্রমে। প্রথমে ছয় মাসের জন্য কিছু করা যায়। এরপর আরও ছয় মাসের জন্য। মোটকথা, এক বাজেটে এটি হবে না। সব মিলিয়ে দেড় থেকে দুই বছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হলে আর কোনো চাপ পড়বে না বলে মনে করছি।

প্রথম আলো:

 নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশের পথে অন্তর্বর্তী সরকার গেল কেন?

 সালেহউদ্দিন আহমেদ: এটার দরকার আছে। প্রায় এক যুগ ধরে নতুন বেতন কাঠামো হচ্ছিল না। ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার টাকার মতো। এটা ভাবা যায়! ভারতে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৯ হাজার ভারতীয় রুপি, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ২ লাখ ৪৪ হাজার ভারতীয় রুপি। বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে তা আরও অনেক বেশি হবে। পাকিস্তানেও প্রতিবছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বৃদ্ধির শতভাগ যৌক্তিকতা আছে।

প্রথম আলো:

  অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দেড় বছর সময়টাকে কেমন উপভোগ করলেন?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: দেড় বছর সময়টা ছিল ‘খুব এক্সাইটিং’। মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। নীতিগত সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ অবশ্য আমার আগে হয়েছে, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তবে এবার ছিল ব্যাপক। কারণ, এবারের ক্ষেত্র ছিল বিশাল।

প্রথম আলো:

 নীতি সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনের প্রভাব ফেলার একটা উদাহরণ যদি দিতেন...

 সালেহউদ্দিন আহমেদ: অনেক উদাহরণ রয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজ তা ভালো অনুধাবন করতে পারবে। একটা বলি। রোজার সময় খেজুরের দাম অনেক বেড়ে যেত প্রতিবছর। খেজুর আমদানিতে আমরা শুল্ক–কর কমিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেই। একজন আমাকে জানালেন, শুল্ক-কর কমার ফলে সরকারি শিশুসদনের ছেলেদের তিনি কম দামে ভালোমানের খেজুর খাওয়াতে পেরেছেন। ট্রাকে দাঁড়িয়ে আমি স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে সবজি বিক্রি করেছি। এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। সব সময়ের জন্য করা গেলে আরও ভালো হতো।

প্রথম আলো:

  দেড় বছরের মধ্যে আপনার বড় ধরনের খারাপ অভিজ্ঞতা কী?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: এটা বলতে গেলে আমাকে বেতন কমিশনের প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হবে। ভাতা দেওয়ার দাবিতে এক দিন আমাকে সচিবালয়ে ঘেরাও করা হলো। টেবিল চাপড়ে কথা বলেছেন অনেকে। এটা আমি আশা করিনি। বেতন কাঠামোর বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। তাঁদের বোঝালাম যে এটা দেওয়া হবে, কিন্তু তাঁরা মানলেন না। পরে যদিও তাঁদের অনেকে ক্ষমা চাইতে এসেছেন যে তাঁদের ভুল হয়েছে।

প্রথম আলো:

  এই সময়ের আমলাতন্ত্র নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

 সালেহউদ্দিন আহমেদ: একটা বড় অংশ বুদ্ধিমান ও সৃজনশীল। বিদেশে গিয়েও তাঁরা ভালো উপস্থাপনা দেন। কিন্তু দেশের ভেতরে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে বেশি চিন্তা করেন। ভালো পদ, ভালো জায়গায় বদলি ইত্যাদি। অথচ প্রশাসনে দরকার হচ্ছে সমন্বিতভাবে কাজ করা এবং দেশের স্বার্থে কাজ করা। আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হচ্ছে ফাইল দুই থেকে তিন মাস ফেলে রাখেন অনেক আমলা। এর উত্তরণ চাই।

প্রথম আলো:

 নির্বাচিত সরকারের প্রতি আপনার কোনো পরামর্শ আছে?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: এই সময়ে ব্যাংক খাতের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। আমরা কিছু কাজ করেছি, আবার কিছু কাজ বাকি আছে। নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য কয়েক পৃষ্ঠার সাকসেসর বা উত্তরাধিকার নোট রেখে যাচ্ছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর কাজ এগিয়ে নিতে সুবিধা হবে। পরবর্তী সরকারের উচিত হবে নতুন কাজ শুরুর বদলে চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা। সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলব দেশের স্বার্থে ও অর্থনীতির স্বার্থে যেটা দরকার, যে মত দেওয়া দরকার, অকপটে ও সাহস করে অর্থমন্ত্রীকে তা অবহিত করতে হবে।

প্রথম আলো:

  বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের কাজটি তো আর হলো না। কেন?

 সালেহউদ্দিন আহমেদ: এ দুটি কাজ অনেক চিন্তাভাবনা করে করতে হবে। নির্বাচিত সরকার এই কাজ করবে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম দুর্নীতির জন্য অনেকে ব্যাংকের পরিচালক এবং এমডিদের দোষারোপ করেন। প্রশ্ন ওঠাটা সংগত যে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ব্যাপারে ভূমিকা কী? অনিয়ম–দুর্নীতি রোধে তাদের কাজটা কী? আমার মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককেও এ ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার বিষয় আছে।

প্রথম আলো:

  পুঁজিবাজারের তো কোনো উন্নতি হলো না। এ প্রসঙ্গে কী বলবেন?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: মুদ্রাবাজারের সঙ্গে পুঁজিবাজারের একটা সম্পর্ক আছে। সব দেশেই তা আছে। আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তখন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় বসতাম। এই আলোচনা বাড়াতে হবে।

প্রথম আলো:

  দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী? আপনার কী আশাবাদ?

 সালেহউদ্দিন আহমেদ: নির্বাচিত সরকার নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে। দরকারি আইনকানুনগুলো প্রণয়ন করবে। আমি খুবই আশাবাদী যে তারা খুব ভালো করবে এবং অর্থনীতিকে একটা ভালো জায়গায় উত্তরণ ঘটাবে।