প্রথম ১০০ দিনের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, একটি উপযোগী বাজেট তৈরি করা
নতুন সরকারের জন্য প্রথম ১০০ দিনের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, একটা উপযোগী বাজেট তৈরি করা। কারণ, তিন মাস হতে না হতেই আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশের সময় হয়ে যাবে। নতুন বাজেটে যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন থাকে।
নতুন সরকারের সামনে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ আছে। সেটি হলো প্রতিশ্রুতি পূরণ তথা প্রত্যাশার ব্যবস্থাপনা। কারণ, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে। তারা নির্বাচনে জয়লাভের ফলে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই প্রত্যাশা তারা রাতারাতি পূরণ করতে পারবে না। যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁরা অদূর ভবিষ্যতে সরকারের কাছ থেকে কী আশা করতে পারেন, সেটি বিএনপির পরিষ্কার করা উচিত হবে। দলটির কাছে তো কোনো জাদুর কাঠি নেই, যা দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বড় বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। তাই প্রত্যাশার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
জাতীয় ইশতেহারের পাশাপাশি বিএনপির স্থানীয় নেতারাও নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সার্বিকভাবে এসব প্রত্যাশার ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজ নয়। তাই তাদের পরিষ্কার করে সময় নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া উচিত, ‘আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিবছরে আমি কোন কাজগুলো করতে পারব, কোনগুলো ধাপে ধাপে কোন সময়ে করে দেওয়া হবে।’
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরির জন্য নিয়মিত বা রুটিন কাজগুলো হয়তো অর্থ মন্ত্রণালয় করে রেখেছে। কিন্তু কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সরকার গঠন করতে যাওয়া দলকেই দিতে হবে। বিশেষ করে ইশতেহারের কোন বিষয়গুলো বাজেটে যুক্ত করা হবে, সেটি নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, তারা ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসতে চায়। এটি করতে হলে খুব বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি রাখা যাবে না। আবার সীমিত বাজেট দিয়ে প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে, সেটিও চিন্তার বিষয়।
বিএনপি বলেছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতনের বিষয়টি তারা বিবেচনায় রাখবে। বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুসারে এক লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ শুধু বেতনের জন্য দিতে হবে। তাহলে বিএনপি পরিবার কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো অন্য যেসব সামাজিক সুবিধার কথা বলেছে, সেগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেটিও ঠিক করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ অন্য বিষয় হচ্ছে, আর্থিক খাতসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এবং বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার আনা। এসব সংস্কার ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। আর্থিক খাতে, বিশেষ করে ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, তা পরিষ্কার করতে হবে। গ্যাস সমস্যার সমাধান সরকার কোন উপায়ে করবে। দেশে বিদ্যুৎ খাতের অনেক চুক্তি অতিমূল্যায়িত। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকারের অবস্থান কী হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা সমস্যা আছে। বন্দর নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী হবে, তা–ও একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ, বন্দরের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। আবার বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তি করা নিয়েও বিরোধিতা রয়েছে। এই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং তা নিয়ে কর্মকৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নির্বাচনের মাধ্যমে একটা বড় মেঘ কেটে গেছে। এখন ক্ষমতার মসৃণ উত্তরণ হবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরকার গঠন হবে। ফলে আর অনিশ্চয়তা নেই। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মন থেকে একটা বড় অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা পরিচালনার অন্য সমস্যাগুলোও বিবেচনায় নেবে। সেগুলো প্রত্যাশিত মাত্রায় সমাধান না হলে তাঁরা অর্থ খরচ করতে চাইবেন না। সব মিলিয়ে আগামী ১০০ দিনের মধ্যে এসব দিকে ইতিবাচক কিছু বার্তা আসলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
লেখক: জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়।