জামানতের দেয়ালে আটকে আছে এসএমইদের ঋণ
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাত দেশের বড় একটি অংশের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে। তবে বাস্তবতা হলো, সরকারের নানা উদ্যোগ ও প্রণোদনার পরও এসএমই উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। নীতি আর বাস্তবতার এই ব্যবধান তাঁদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এসএমই খাত থেকে আসে। আর মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সৃষ্টি করে এই এসএমই খাত। এত বড় অবদানের পরও ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের ২০ শতাংশের কম এই খাতে যায়, যা স্পষ্টভাবে অপর্যাপ্ত। ছোট উদ্যোক্তাদের কম ঋণ পাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে—ব্যাংকগুলোর কঠোর জামানত নীতি। অধিকাংশ ব্যাংক এখনো জমি বা মূল্যবান স্থায়ী সম্পত্তিকে ঋণের জন্য বাধ্যতামূলক জামানত হিসেবে চায়। ফলে নতুন উদ্যোক্তা ও প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ নিতে ব্যর্থ হন। এমনকি যেসব ব্যবসার নিয়মিত নগদ প্রবাহ আছে, তাঁরাও জমি বা সম্পত্তি না থাকায় ঋণ পান না। এ কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁরা উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঝুঁকি প্রায় না থাকলেও উদ্যোক্তাদের একই ভোগান্তি পোহাতে হয়। সম্প্রতি এমনই একটি উদাহরণ দেখা গেছে। একজন তরুণ উদ্যোক্তা নিজের ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) জামানত রেখে একটি ওভারড্রাফট ঋণসুবিধা নেন। ঋণটি ছিল শতভাগ নিরাপদ। তবু ঋণ অনুমোদনে অযথা দেরি, অতিরিক্ত কাগজপত্র ও বারবার ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা পোহাতে হয়েছে সেই উদ্যোক্তাকে। এরপর সামান্য বিলম্বে কিস্তি পরিশোধ করায় অপ্রয়োজনীয় চাপও তৈরি করা হয়। নবায়নের সময় ব্যাংক একসঙ্গে পুরো বকেয়া পরিশোধের দাবি করে, যা একটি চলমান ব্যবসার জন্য বাস্তবসম্মত নয়। এ ধরনের আচরণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার যুক্তি ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই প্রক্রিয়াগত জটিলতার সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ সুদের হার ও অতিরিক্ত মাশুল। বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ১৭-১৮ শতাংশ বা তারও বেশি সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ ছোট ব্যবসার লাভ খুব সীমিত। ফলে ব্যাংকঋণ অনেক সময় উদ্যোক্তাদের জন্য টেকসই সমাধান হয়ে ওঠে না। ব্যাংকগুলো প্রায়ই বলে, উদ্যোক্তাদের হিসাবপত্র ঠিকভাবে নেই বা আর্থিক নথি অসম্পূর্ণ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অবশ্যই জরুরি। তবে শুধু এ কারণে এসএমই খাতকে পুরোনো জামানতনির্ভর ব্যবস্থায় আটকে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না। আসল সমস্যা উদ্যোক্তাদের নয়, বরং এমন ব্যাংকিং পণ্য ও নিয়মকানুন—যা ছোট ব্যবসার বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই নয়।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি চায়, তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব ব্যাংকিং সংস্কার এখন সময়ের দাবি। ঋণ অনুমোদন সহজ করা, নবায়নে নমনীয়তা আনা এবং জামানতের বদলে ব্যবসার নগদ প্রবাহ দেখে ঋণ দেওয়ার দিকে এগোতে হবে।
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এত বড় অবদান রাখা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এখনো ব্যাংক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধার মুখে। এই বাধা দূর না করলে প্রবৃদ্ধি, নতুন উদ্যোগ এবং অর্থনীতিতে তাঁদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এখন দরকার বাস্তবসম্মত, সাহসী এবং উদ্যোক্তাবান্ধব সিদ্ধান্ত।
আসিফ ইব্রাহিম, সাবেক সভাপতি, ঢাকা চেম্বার