সিটিজেন্‌স ব্যাংক

করপোরেট সুশাসন শতভাগ মেনে চলার চেষ্টা করছি

প্রথম আলো:

আপনাদের লক্ষ্য অনুযায়ী অগ্রগতি কেমন হচ্ছে? নতুন ব্যাংক হিসেবে প্রথাগত ব্যাংকিং কাঠামোর বাইরে গিয়ে আপনারা কীভাবে নতুন পথ তৈরি করছেন?

আলমগীর হোসেন: সিটিজেন্​স ব্যাংকের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে। সাধারণ ডিপোজিট নেওয়া ও ‘ট্রেড বিজনেসে’র মতো প্রথাগত ব্যাংকিং দিয়েই শুরুটা হয়েছিল। তবে বর্তমানে প্রথাগত ব্যাংকিং ধারা থেকে বেরিয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে চিন্তা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকটিকে ভবিষ্যতে একটি ‘এসএমই ও রিটেইল ফোকাসড’ ব্যাংকে রূপান্তর করা। দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধানতম সংকট হলো সিংহভাগ ঋণ করপোরেট খাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। আমরা কিছুটা করপোরেট ব্যাংকিং করলেও মূল মনোযোগ রাখছি এসএমই, খুচরা ও কৃষি খাতে, যাতে দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। 

এর জন্য পল্লি অঞ্চলে  উপশাখা সম্প্রসারণ করছি এবং সম্প্রতি এজেন্ট ব্যাংকিং লাইসেন্স পেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য থাকবে গ্রামের আমানত শহরে না এনে সেই অর্থ দিয়ে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষি খাতে পুনর্বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অ্যাপভিত্তিক ই-কেওয়াইসি, অনলাইন হিসাব খোলা, বিএফটিএন, আরটিজিএস, বাংলা কিউআর ও পি-টু-পি লেনদেনের সুবিধা প্রসারিত করেছি। ব্যাংকের বর্তমানে মোট লেনদেনের প্রায় ৪২ শতাংশই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৮ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ লেনদেন ডিজিটালে রূপান্তর করতে আমরা দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি। 

ব্যাংকের বর্তমানে মোট লেনদেনের প্রায় ৪২ শতাংশই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৮ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ লেনদেন ডিজিটালে রূপান্তর করতে আমরা দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি।
আলমগীর হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিটিজেন্​স ব্যাংক
প্রথম আলো:

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বড় কাঠামোর ব্যাংকের চেয়ে একটি ‘স্মার্ট’ ব্যাংকের সুবিধা কী কী? 

আলমগীর হোসেন: ব্যাংকিং খাতের পুরোনো ও বড় অনেক ব্যাংক তাদের অতীতের লুক্কায়িত সমস্যা ও খেলাপি ঋণের চাপ সামলাতে ব্যস্ত। নতুন ও ছোট ব্যাংক হিসেবে আমাদের প্রধান সুবিধা হলো—ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলা। বড় ব্যাংকে একটি করপোরেট গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠান বিপদে পড়লে পুরো ব্যাংক সমস্যায় পড়ে, কিন্তু এসএমই বা খুচরায় সেই একক ঝুঁকি থাকে না। আমরা করপোরেট সুশাসন শতভাগ মেনে চলার চেষ্টা করছি। ছোট ও গতিশীল ব্যাংক হওয়ায় সেটি কঠিন হচ্ছে না।

প্রথম আলো:

শুরু থেকেই খেলাপিমুক্ত ও ভালো গ্রাহক টানতে আপনারা কী নীতি অনুসরণ করছেন?

আলমগীর হোসেন: ২০২৬ সালের জুনভিত্তিক তথ্যানুযায়ী আমাদের শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ০ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা পুরো ব্যাংকিং খাতে সর্বনিম্ন। একটি নিরেট ও স্বাস্থ্যকর পোর্টফোলিও ধরে রাখতে মূল নীতিগুলো হলো—আমাদের ঋণ বিপণন এবং ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন বিভাগ আলাদা ও স্বাধীনভাবে কাজ করে। পর্ষদের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট সমঝোতা রয়েছে যে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং কোনো ব্যবসায়িক হস্তক্ষেপ করবে না।

প্রথম আলো:

তরুণ উদ্যোক্তা ও আধুনিক গতিশীল ব্যবসা আকর্ষণ করতে আপনাদের সেবাগুলো কীভাবে সাজিয়েছেন?

আলমগীর হোসেন: বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমানে এসএমই খাতের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন স্কিম রয়েছে, যেখান থেকে ৩ থেকে ৯ শতাংশের মতো কম সুদে ঋণ দেওয়া সম্ভব হয়। 

অনেক তরুণ বা নতুন উদ্যোক্তার কাছে ব্যাংকঋণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রথাগত কাগজপত্র বা আর্থিক বিবরণী থাকে না। তাদের পরামর্শক হিসেবে সহায়তা দিচ্ছি।

প্রথম আলো:

ব্যাংকিং সেবাকে পুরোপুরি কাগজের ব্যবহারমুক্ত করার পথে অগ্রগতি কতটুকু?

আলমগীর হোসেন: আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও অ্যাপ প্ল্যাটফর্মকে আরও বেশি ব্যবহার উপযোগী এবং কাগজের ব্যবহারমুক্ত রাখতে মূল প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছি। এখন গ্রাহকেরা ঘরে বসেই হিসাব খোলা থেকে শুরু করে বিবরণী নেওয়া ও নিয়মিত লেনদেন সম্পন্ন করতে পারছেন। 

প্রথম আলো:

গ্রাহকের ডিজিটাল আস্থা অর্জনে নিরাপত্তাকাঠামোতে সিটিজেন্​স ব্যাংক কী গুরুত্ব দিচ্ছে?

আলমগীর হোসেন: ডিজিটাল ব্যাংকিং বা এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবহারে গ্রামীণ ও কিছুটা কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে জালিয়াতি বা অর্থ হারানোর একধরনের ভয় কাজ করে। এই ভয় কাটানোর একমাত্র উপায় হলো নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করা। আমরা আমাদের পল্লি অঞ্চলের শাখা, স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং তৈরি পোশাক কারখানায় গিয়ে গ্রাহকদের সুরক্ষিত ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপারে সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনা করছি। 

প্রথম আলো:

সিটিজেন্​স ব্যাংকের অবস্থান আরও ভালো করতে কী পরিকল্পনা আছে?

আলমগীর হোসেন: ভবিষ্যতের আধুনিক ব্যাংকিং খাপখাইয়ে নিতে মূল পরিকল্পনাগুলো হলো—গ্রামীণ ও আধা-শহুরে অর্থনীতিকে যুক্ত করতে আগামী ছয় মাসে ২৭টি নতুন শাখা-উপশাখা চালু এবং দেশব্যাপী এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম গতিশীল করা; বিকাশ বা নগদের মতো এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক মানুষের কাছে অতিক্ষুদ্র ঋণ পৌঁছে দেওয়া।

আরও পরিকল্পনার মধ্যে আছে—ক্যাশলেস ও পেপারলেস ব্যাংকিং ত্বরান্বিত করতে বাংলা কিউআর ও ইন্টারঅপারেবিলিটি সুবিধার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানো; বোর্ডে ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন বজায় রেখে খেলাপি ঋণের হার সর্বনিম্নে রাখা; একটি সর্বাধুনিক, ঝুঁকিমুক্ত ও দেশের প্রান্তিক মানুষের আস্থাভাজন ‘স্মার্ট ব্যাংক’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করাই সিটিজেন্​স ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।