শহরের চাপ সামলাতে নতুন নগরায়ণ ভাবনা প্রয়োজন

স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্পেসজিরো লিমিটেড

গত তিন-চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে কি না, সে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে বেড়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যায় আবাসন, নির্মাণ ও ভবনশিল্পে।

শুধু শহর নয়, গ্রামেও এর পরিবর্তন স্পষ্ট। একসময় যেখানে টিনের ঘর ছিল, সেখানে এখন মানুষ স্থায়ী ভবন তৈরি করছেন। বিদেশে বা শহরে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পর অনেকেই গ্রামে নিজেদের একটি স্থায়ী বাড়ি করতে চান। এটি মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রতিফলন। যদিও এই আকাঙ্ক্ষাকে পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলিত করার কাজটি আমরা যথাযথভাবে করতে পারিনি।

আমরা নগর–পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু গ্রামীণ পরিকল্পনা নিয়ে কম ভাবি। অথচ বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করেন। পরিকল্পনার অভাবে মানুষ অনেক সময় কৃষিজমি, বিশেষ করে ধানি জমি আবাসনের জন্য ব্যবহার করছেন। একজন মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তাঁর হয়তো আগে জমি বা বাড়ি ছিল না। এখন তিনি জমি কিনে সেখানে বাড়ি করছেন। প্রতিটি গ্রামের জন্য একটি মৌলিক বসতি পরিকল্পনা থাকলে এই পরিবর্তনকে অনেক বেশি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো। এখনো সেই সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

শহরের ওপর বাড়তি চাপ 

নগরায়ণের মূল চাপ পড়ছে শহরগুলোতে। শহর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ায় মানুষ কাজ, শিক্ষা ও জীবিকার জন্য শহরমুখী হচ্ছেন। আমাদের শহরগুলো সেই চাপ নিতে পারছে না। একই সঙ্গে শহরের সম্প্রসারণও পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না।

ঢাকার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা ড্যাপ বা বিভিন্ন মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলি। সেখানে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; মানুষের বাস্তব চাহিদাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে, সঙ্গে আবাসনের চাহিদাও। একজন মানুষ ঢাকায় এসে কাজ করেন; তিনি ৮০০, ১,০০০ বা ১,২০০ বর্গফুটের একটি বাসায় থাকতে চান। গত ৫০ বছরে আমরা কি সেই মানুষকে পর্যাপ্ত পরিকল্পিত ও সুন্দর আবাসনের সুযোগ দিতে পেরেছি?

প্রতিটি প্লটকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কতটুকু নির্মাণ করা যাবে—এসব নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে শহরটি কোথায় যাবে এবং কীভাবে বড় হবে, সেই পরিকল্পনা দেখা যায় না। ঢাকায় এখন বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করছেন। জমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ নেই। ফলে আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে বাংলাদেশে ভবিষ্যতের নগরায়ণে উচ্চ ঘনত্ব থাকবেই। পৃথিবীর অনেক শহরের মতো এখানে হয়তো খোলামেলা, কম ঘনত্বের নগরায়ণ সম্ভব হবে না। ঘনত্ব নিজেই সমস্যা নয়; প্রশ্ন হলো এই ঘনত্বকে কীভাবে সৃজনশীলভাবে ব্যবস্থাপনা করে বাসযোগ্য শহর তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা এখন প্রায় ৩৩ শতাংশ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই নগরায়ণের এই চাপকে ভবিষ্যতের সমস্যা হিসেবে না দেখে এখন থেকেই নতুন ধরনের নগর উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

আবাসন উন্নয়নে বেসরকারি খাত

এই পরিবর্তনে বেসরকারি আবাসন ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় সরকারি আবাসনই ছিল প্রধান ব্যবস্থা। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন সরকারি কলোনি গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি আবাসন উন্নয়ন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে যৌথ উদ্যোগ ও ডেভেলপার-নির্ভর আবাসন মডেল গড়ে ওঠে।

প্রায় তিন দশক আগেও একজন জমির মালিকের সঙ্গে যৌথভাবে একটি জমিতে ২০, ২৫ বা ৩০টি পরিবারের জন্য আবাসন তৈরি করা ছিল অনেকটাই নতুন ধারণা। আজ কয়েক শ, এমনকি ৪০০, ৫০০ বা হাজারের বেশি পরিবারের জন্য বড় আবাসন কমিউনিটি তৈরি হচ্ছে। শহরের ভেতরে এত বড় জমি পাওয়া কঠিন বলে এসব প্রকল্প শহরের প্রান্তে যাচ্ছে। সেখানে নতুন রাস্তা, পানি, বিদ্যুৎ, ড্রেনেজসহ নানা অবকাঠামোর প্রয়োজন হচ্ছে।

অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান নিজেদের উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি থেকে এই অবকাঠামো তৈরিতে এগিয়ে আসছে। এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি হলো মানুষের চাহিদা। অর্থাৎ আবাসন খাত শুধু ভবন নির্মাণ করছে না; নতুন নতুন নগর কমিউনিটিও তৈরি করছে।

আবাসনে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভাবনা

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশবান্ধব বা সবুজ আবাসন। তৈরি পোশাক খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং ক্রেতাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য বাংলাদেশ পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণে এগিয়ে গেছে। দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত নানা বাস্তবতাও এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। 

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাক কারখানার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে। তবে আবাসন খাতে এই চর্চা এতটা আগে শুরু হয়নি। এখন অনেক কোম্পানি পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরির দিকে এগোচ্ছে। এর জন্য বড় ধরনের কোনো বিশেষ প্রণোদনা তারা পাচ্ছে না। মূলত নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকেই অনেক প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগ নিচ্ছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। আমরা নিজেরা দায়িত্বশীল আচরণ না করে শুধু অন্যদের কাছ থেকে সহায়তা আশা করতে পারি না। আবাসন খাতেরও পরিবেশের প্রতি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।

একটি পরিবেশবান্ধব ভবনে সাধারণ ভবনের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। দিনের আলো ব্যবহার, ভবনের সঠিক অভিমুখ, উপযুক্ত কাচ ও তাপ নিয়ন্ত্রণের মতো নকশাগত কৌশলের মাধ্যমে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ওপর চাপ কমানো যায়। অথচ একটি ভবনে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের জায়গাগুলোর একটি হলো এয়ারকন্ডিশনিং।

পরিবেশবান্ধব আবাসনকে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রকৃত টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ও যুক্ত। একটি আবাসন কতটা পরিবেশবান্ধব, তার পাশাপাশি সেটি কতটা সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নাগরিকবান্ধব এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই—সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

শহরের ভেতরে জনপরিসর ফিরিয়ে আনা

আমাদের শহরে পরিকল্পিত এলাকার পাশাপাশি বিশাল অংশ অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, উত্তরা, বনানী, গুলশানের মতো পরিকল্পিত এলাকার বাইরে অনেক এলাকার রাস্তা সরু, খোলা জায়গা কম এবং জমির ব্যবহার অত্যন্ত ঘন।

এক বা দেড় কিংবা দুই কাঠা জমিতে ভবনের পর ভবন তৈরি হচ্ছে। এসব এলাকায় এখন নতুন করে কীভাবে জনপরিসর তৈরি করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়; মানুষের জন্য খোলা জায়গা, হাঁটার সুযোগ, ছোট মাঠ, পুকুর ও সামাজিক পরিসরও প্রয়োজন।

কোথাও পুকুর থাকলে সেটি ভরাট হওয়া ঠেকাতে হবে। কোথাও ছোট একটি মাঠ থাকলে, সেটিও রক্ষা করতে হবে। শহরে ছড়িয়ে থাকা সরকারি পরিত্যক্ত জমি, জলাভূমি ও অন্যান্য অব্যবহৃত জায়গা চিহ্নিত করে জনস্বার্থে পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে। এটি হয়তো ছোট ছোট উদ্যোগ মনে হবে, কিন্তু সম্মিলিতভাবে এগুলো শহরের বাসযোগ্যতা অনেক বাড়াতে পারে।

শহরকে বাঁচানোর কাজ শুধু নতুন শহর তৈরি করে করা যাবে না। বিদ্যমান শহরের ভেতরেও যে জায়গাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে।

উন্নয়নকে বাধা নয়, সহায়তা করতে হবে

আবাসন ও নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমস্যার শেষ নেই। রাজউক, সিটি করপোরেশন, পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিসসহ অনেক সংস্থা উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে তাদের ভূমিকা শুধু নিয়ন্ত্রণকারী হলে চলবে না; তাদের উন্নয়নের সহায়ক অংশীদার হতে হবে।

গত চার দশকের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, মানুষ নানা বাধার মধ্যেও এগিয়ে গেছেন। কেউ কারখানা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন, কেউ বাড়ি করতে গিয়ে, কেউ ব্যবসা করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় গ্যাস বা অবকাঠামো পাননি। এরপরও মানুষ নিজের উদ্যোগে দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন।

এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আমলাতন্ত্রকে উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে পুনর্বিবেচনা করার। তাদের কাজ হবে উন্নয়নকে অন্ধভাবে বাধা দেওয়া নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে উন্নয়নকে আরও সুশৃঙ্খল ও টেকসই করা।

বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্ন, শুধু কত বেশি বাড়ি বা কত বড় শহর তৈরি হবে, তা নয়; মূল প্রশ্ন হলো সীমিত ভূমি ও সম্পদের মধ্যে কীভাবে ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য আরও বাসযোগ্য, সবুজ, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই নগরজীবন নিশ্চিত করা যায়। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের নগরায়ণের প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন নগরায়ণ ভাবনা গ্রহণ করতে হবে।

স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্পেসজিরো লিমিটেড