সাক্ষাৎকার

কার্ডে লেনদেন বছরে ২০% হারে বাড়ছে

২০২৪ সালের এপ্রিলে ডিজিটাল পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান ভিসার বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেন সাব্বির আহমেদ। সম্প্রতি তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট, ক্যাশলেস ব্যবস্থার অগ্রগতি ও নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

প্রথম আলো:

 আপনি ভিসার বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছর পার হয়েছে। এ সময় কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

সাব্বির আহমেদ: গত দুই বছর এই অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও নেপালে বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবে এই পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের ওপরও পড়েছে। আমরা দেখেছি তীব্র আন্দোলনের সময় যখন অবরুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল, তখন ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা কিছুটা থমকে গিয়েছিল। তবে এক-দেড় মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ অত্যন্ত সহনশীল (রেজিলিয়েন্ট) একটি দেশ।

প্রথম আলো:

আপনি দেশের ভেতরের চিত্র বললেন। আন্তর্জাতিক (ক্রস-বর্ডার) লেনদেনের পরিস্থিতি কেমন?

সাব্বির আহমেদ: এই জায়গায় কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব এখনো রয়েছে। কার্ডের সবচেয়ে বড় ব্যবহার হয় যখন মানুষ দেশের বাইরে ভ্রমণে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রাপ্তি সীমিত বা বন্ধ করেছে। ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর থেকে আমাদের আন্তর্জাতিক লেনদেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে। আমরা আশা করেছিলাম নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তবে আন্তর্জাতিক লেনদেনে এখনো তেমন বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

* ৫ বছরে গ্রাহকসংখ্যা দ্বিগুণ করতে চাই
* দেশের ক্রেডিট কার্ড বাজারের ৭২% ভিসার
প্রথম আলো:

ডিজিটাল পেমেন্ট বা ক্যাশলেস সোসাইটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান অবস্থা কী?

সাব্বির আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো নগদ টাকায় (ক্যাশ) হয় এবং বাকি ৩০ শতাংশ হয় ডিজিটাল মাধ্যমে। একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে এই ৭০ শতাংশ নগদের ওপর নির্ভরতা মোটেও আদর্শ নয়। ভবিষ্যতে এই অনুপাত পুরোপুরি উল্টে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ ৩০ শতাংশ নগদ ও ৭০ শতাংশ ডিজিটাল লেনদেন। যদিও গত দুই দশকে ভালো অগ্রগতিও হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে।

প্রথম আলো:

কার্ড পেমেন্টকে সহজ করতে আপনারা নতুন কী প্রযুক্তি এনেছেন?

সাব্বির আহমেদ: আমরা পেমেন্ট প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’ বা স্পর্শহীন পেমেন্টের ব্যবস্থা চালু করেছি। আগে কার্ড দিয়ে পিন নম্বর দেওয়া, যন্ত্রে সোয়াপ করতে হতো। এখন দেশের প্রায় সব ব্যাংক তাদের কার্ডে এনএফসি প্রযুক্তি যুক্ত করেছে এবং মার্চেন্টদের পিওএস যন্ত্রগুলোও এর উপযোগী করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ১০টি কার্ড পেমেন্টের মধ্যে ৬টিই হচ্ছে এই ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’ প্রযুক্তির মাধ্যমে। আগে পিন ছাড়া ট্যাপ করার একটি নির্দিষ্ট সীমা ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত করেছে।

প্রথম আলো:

প্রান্তিক অঞ্চলে ডিজিটাল লেনদেনের অবস্থা কেমন?

সাব্বির আহমেদ: আমাদের ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা এখনো প্রধানত মেগাসিটি বা বড় শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উপজেলা পর্যায়ে এখনো নগদ টাকার লেনদেনই সবচেয়ে বেশি। প্রান্তিক মার্চেন্টদের জন্য আমরা ‘ভিসা একসেপ্ট’ নামের একটি সহজ প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে কাজ করছি। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিক্রেতাদের যদি ব্যাংক হিসাব এবং তার বিপরীতে একটি ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড থাকে, তাহলে নতুন কোনো নথিপত্র ছাড়াই তারা সরাসরি ডিজিটাল লেনদেনে অংশ নিতে পারবে।

প্রথম আলো:

অনেকেই ডিজিটাল জালিয়াতির ফাঁদে পড়ছেন। এই ধরনের প্রতারণা থেকে গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভিসা কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে?

সাব্বির আহমেদ: সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা দুটি বড় ধারায় পরিচালনা করি। প্রথমত, আমাদের মূল পেমেন্ট নেটওয়ার্ককে সাইবার হ্যাকারদের হাত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা। এ জন্য প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ভিসার ইতিহাসে এই অভেদ্য সাইবার নিরাপত্তাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। দ্বিতীয় ধারাটি হলো গ্রাহক পর্যায়ে কার্ড ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো। যেমন বাংলাদেশে একটি সাধারণ জালিয়াতি হলো ওটিপি শেয়ারিং। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আমরা প্রথমবারের মতো নিয়ে এসেছি ‘পাস-কি’ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি স্মার্টফোন আনলক করার জন্য মানুষ যেভাবে ফেস আইডি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা প্যাটার্ন লক ব্যবহার করেন, ঠিক একই বায়োমেট্রিক বা প্যাটার্ন ব্যবহার করে যেকোনো ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত (অথেনটিকেট) করা যাবে। ইতিমধ্যে দুটি ব্যাংকের সঙ্গে এটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

প্রথম আলো:

দেশে বিকাশ, নগদ, রকেট বা বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাপগুলোর ব্যবহার ডিজিটাল লেনদেনকে সহজ করেছে। ভিসা কি এদের প্রতিযোগী মনে করে, নাকি সহযোগী?

সাব্বির আহমেদ: আমরা তাদের সম্পূর্ণ সহযোগী মনে করি। দেশে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ কার্ডের মাধ্যমে তাঁদের ওয়ালেটে ‘অ্যাড মানি’ করছেন। ওয়ালেটের ব্যবহার যত বাড়ছে, কার্ডের এই উপযোগিতাও তত বাড়ছে। আবার অ্যাপ বা ওয়ালেটে টাকা না থাকলে গ্রাহক তাঁর কার্ড থেকে সরাসরি পেমেন্ট করতে পারছেন।

সাব্বির আহমেদ, ভিসার বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার।
প্রথম আলো:

বাংলাদেশে মাস্টারকার্ড বা অ্যামেক্সের মতো প্রতিযোগী থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আপনারা জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন?

সাব্বির আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ক্রেডিট কার্ড বাজারের প্রায় ৭২ শতাংশ শেয়ার এখন ভিসার নিয়ন্ত্রণে। ডেবিট কার্ডের কোনো আলাদা তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশ করে না। তবে সেখানেও আমাদের অংশীদারত্ব ক্রেডিট কার্ডের সমান বা তার চেয়ে বেশি হবে। ভিসার এই জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি হলো ‘আস্থা’। ভিসা বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশে কাজ করে। বাংলাদেশেও ৪০ বছর ধরে কাজ করছে ভিসা। আপনি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যান না কেন, সেখানে ভিসা পেমেন্টের সুবিধা পাবেন। আবার ভিসার নেটওয়ার্কের ত্রুটির কারণে লেনদেন বাতিল হওয়ার ঘটনা প্রায় শূন্য। এই বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার কারণেই আমরা শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পেরেছি।

প্রথম আলো:

দেশে ক্রেডিট কার্ডের বাজারের চিত্রটি কেমন?

সাব্বির আহমেদ: দেশের ক্রেডিট কার্ডের বাজার এখনো অত্যন্ত সংকুচিত। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে মোট ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা মাত্র ২৫ থেকে ২৬ লাখ। এর মধ্যে অনেকের একাধিক কার্ড থাকায় প্রকৃত গ্রাহকসংখ্যা ১৫ থেকে ১৬ লাখের বেশি নয়, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। ফলে এই বাজারে আমাদের প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে। আমরা এই হার ন্যূনতম ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে কাজ করছি।

প্রথম আলো:

আগামী পাঁচ বছরকে সামনে রেখে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে কী?

 সাব্বির আহমেদ: বাংলাদেশে প্রতিবছর আমাদের সামগ্রিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ২৪ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে আমরা ডিজিটাল লেনদেনের গ্রাহকসংখ্যা দ্বিগুণ করতে চাই।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশে ‘গুগল পে’ চালুর বিষয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?

সাব্বির আহমেদ: গত বছর আমরা গুগলের সঙ্গে যৌথভাবে ‘গুগল পে’ সেবা চালু করেছি। প্রথমে সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে শুরু হলেও এখন ব্র্যাক ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংকও এই সেবা দিচ্ছে। আর ‘অ্যাপল পে’ চালু করা নিয়েও আমরা কাজ করছি।