শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি আসার পথ সহজ হবে

রুবাইয়াত ই ফেরদৌস

শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ উন্মুক্ত করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। দেশের পুঁজিবাজারে ভালো ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আনতে এ ধরনের বিকল্প পথ থাকা দরকার। ভারতের শেয়ারবাজারে আমরা দেখি, অফার ফর সেলসহ বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়মিত বড় বড় কোম্পানি বাজারে যুক্ত হচ্ছে। সেখানে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে কোম্পানি নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, আবার উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীরাও তাঁদের শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করতে পারেন। ফলে কোম্পানি ও উদ্যোক্তা—উভয়েরই উপকৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

উদ্যোক্তারা তাঁদের শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করে যে অর্থ পান, তা নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে পারেন। এসব নতুন উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে আবার পুঁজিবাজারে আসার সুযোগ পায়। এভাবেই ভালো উদ্যোক্তা ও কোম্পানির সঙ্গে পুঁজিবাজারের সংযোগ তৈরি হয়। দেরিতে হলেও বিএসইসি এখন সরাসরি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা আরও বিস্তৃতভাবে উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে এবং এর ওপর শেয়ারবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অন্যান্য অংশীজনের মতামত চাওয়া হয়েছে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। সেই অভিজ্ঞতায় দেখেছি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক কোম্পানি বাজারে আসতে আগ্রহী হয় না। আবার অনেক কোম্পানি আছে, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নতুন মূলধনের দরকার হয় না বা ব্যবসা সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনাও নেই। ফলে শুধু মূলধন সংগ্রহের জন্য তাদের আইপিওতে আসার দরকার হয় না। সরাসরি তালিকাভুক্তি এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে তুলনামূলক কম সময়ে একটি কোম্পানির তালিকাভুক্তি সম্ভব হতে পারে। প্রক্রিয়াটি কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হলে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেও তালিকাভুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হতে পারে। এরই মধ্যে আমাদের কাছে বেশ কিছু কোম্পানি তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে উদ্যোক্তারা তাঁদের শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করতে পারবেন এবং সেই বিক্রয়মূল্য তাঁদের হিসাবেই যাবে। অন্যদিকে কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার ফলে প্রচলিত আইনের আওতায় প্রযোজ্য কর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে দেশি ও বিদেশি—উভয় ধরনের উদ্যোক্তাই এ প্রক্রিয়ায় তাঁদের কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে আগ্রহী হতে পারেন বলে আশা করছি।

বিএসইসি নতুন যে খসড়া তৈরি করেছে, তাতে সাত ধরনের কোম্পানির জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে। তার মধ্যে সরকারের সম্পূর্ণ বা আংশিক মালিকানাধীন কোম্পানি এবং বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার দেশীয় কোম্পানির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ভালো ও বড় কোম্পানিগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের শর্ত নির্ধারণকে আমরা যৌক্তিক মনে করি।

নতুন বিধিমালাটি চূড়ান্ত হলে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও পুঁজিবাজারে আনার সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর জন্য যে সুযোগ রাখা হয়েছে, সেটিও একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

একজন মার্চেন্ট ব্যাংকার হিসেবে এ বিষয়ে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, দেশে যেসব কোম্পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুপরিচিত ব্র্যান্ড, সুনাম ও সুশাসন রয়েছে, সেগুলোকে প্রয়োজনবোধে কিছু শর্তে ছাড় দিয়ে হলেও পুঁজিবাজারে আনার সুযোগ থাকা উচিত। খসড়া বিধিমালায় বিএসইসিকে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তে ছাড় দেওয়ার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটিও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

নতুন এই বিধিমালা নিয়ে বিএসইসি মার্চেন্ট ব্যাংকসহ অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছে। সেই বৈঠকে আমরা আমাদের মতামতগুলো তুলে ধরব। প্রত্যাশা করছি, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভালো কোম্পানির পুঁজিবাজারে আসার পথ সহজ হবে। যত বেশি ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে, বাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগযোগ্যতার পরিধি তত বাড়বে। বিনিয়োগকারীর জন্য ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: রুবাইয়াত ই ফেরদৌস, সিইও, শান্তা ইকুইটি