পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী

গ্রাহকসেবায় এআইভিত্তিক পণ্য চালুর পরিকল্পনা করছি

জাতীয়করণ থেকে বেসরকারি খাত, এরপর নানা পুনর্গঠন—এমন নানা ধাপ পেরিয়ে এখন দেশের আধুনিক ও শীর্ষ ব্যাংকের একটি পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানাউল্লাহ সাকিব

প্রথম আলো:

পূবালী ব্যাংকের আধুনিকায়নের শুরু আপনার হাত ধরে। কতটুকু এগোলেন?

মোহাম্মদ আলী: পূবালী ব্যাংক দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক। আমাদের স্লোগানও সেই ধারা বহন করে। একসময় ব্যাংকটি ‘প্রবলেম ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত ছিল। আমার যোগদানের পর থেকে প্রধান এজেন্ডা ছিল ব্যাংকটিকে সেই অবস্থা থেকে বের করে আনা। পাশাপাশি এটিকে তথ্যপ্রযুক্তি-চালিত আধুনিক ব্যাংকে রূপান্তর করা। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির সব শাখাকে অনলাইন বা কোর-ব্যাংকিংয়ের আওতায় নিয়ে আসি। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের কথা বলতে গেলে কিছু সেবার সূচকের কথা বলতে হয়। বর্তমান অর্থনীতিতে কিউআর কোড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মার্চেন্ট বা দোকানকে বাংলা কিউআর কোড সেবার আওতায় এনেছি। পুরো ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৫০ শতাংশ এখন পূবালী ব্যাংকের কিউআর পেমেন্ট নেটওয়ার্কের আওতায়। দেশের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) যন্ত্রের অর্ধেকই আমাদের ব্যাংকের। আমাদের অ্যাপ দিয়ে ২০২৫ সালে এক লাখ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। চলতি বছরে দুই লাখ কোটি টাকা লেনদেনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্র্যাক, সিটি ও ইসলামী ব্যাংকের পরই আমাদের অবস্থান। এটিএম বুথের সংখ্যার দিক থেকেও আমরা শীর্ষ পর্যায়ে চলে এসেছি।

প্রথম আলো:

ডিজিটাল রূপান্তর পূবালী ব্যাংকের আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে কতটা ভূমিকা রাখল?

মোহাম্মদ আলী: ২০২৪ সালে আমাদের আমানত বেড়েছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। আমাদের ব্যাংকের বয়স যখন ৫০ বছর ছিল, তখন ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকার। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ৫০ বছরে যা বেড়েছে, তার পরের ১৭ বছরে তার দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বেড়েছে। আগে যে কাজ করতে ১০ জন মানুষ লাগত, প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে এখন ১ জন মানুষ সেই পরিমাণ কাজ করতে পারছেন। আমাদের শাখা ও ব্যবসার পরিধি বাড়লেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়ানোর প্রয়োজন হয়নি। এটি আমাদের খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে আমাদের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আমরা আশা করছি, নিট মুনাফা ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ। পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ থেকে কমে এখন ২ দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম আলো:

ব্যাংক খাতে নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ চলছে আবার। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ আলী: পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আসলে অনেক বিষয় চিন্তা করতে হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি কারণ হলো বিগত সরকারের সময় যারা বাস্তবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের কীভাবে এই সংকট থেকে বের করে আনা যায়। এ ছাড়া দেশে খেলাপি ঋণ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বর্তমানে নীতি সহায়তার কারণে অনেক বড় ও ভালো প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার আওতায় এসেছে। আমাদের ধারণা আগামী মার্চের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৪-২৫ শতাংশে নেমে আসবে। ব্যাংকিং খাত যদি সঠিকভাবে এগিয়ে যায় ও পরিশ্রম করে, তাহলে দুই বছরের মধ্যে খেলাপির হার ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বজায় রাখা এবং গ্রাহকের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি স্থিতিশীল ও আধুনিক ব্যাংক হিসেবে পূবালী ব্যাংককে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।
প্রথম আলো:

বিগত সময়ে ব্যাংক দখল ও লুটপাটের যে সংস্কৃতি দেখা গেছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় কী?

মোহাম্মদ আলী: এখন সংস্কার কার্যক্রম চলছে এবং এটি টেকসই হতেই হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে এবং গভর্নরকে বছরে দুবার সংসদে জবাবদিহি করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক কোম্পানি আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন জরুরি। এসব সংস্কার হয়ে গেলে এবং রাষ্ট্র কোনো অশুভ তৎপরতাকে পৃষ্ঠপোষকতা না করলে ভবিষ্যতে এমন সংকট আর হবে না। ব্যাংক খাত আর খারাপ হবে না। আমাদের দেশের ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আশা করি, সবাই এখন বিষয়টা বোঝেন।

প্রথম আলো:

পূবালী ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ করোপোরেট খাতে। তাদের বর্তমান অবস্থা কী?

মোহাম্মদ আলী: আমাদের ঋণের প্রায় ৫৬ শতাংশ হলো করপোরেট খাতে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোই করছে। বড় করপোরেটদের অনেকগুলোর নেতৃত্বে এসেছে পরবর্তী প্রজন্ম। যাঁরা শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় সন্তানদের ব্যবসায় যুক্ত করেছেন, তাঁরা নেতৃত্ব নিয়ে ব্যবসায় ভালো করছেন। তবে মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তারা কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে আছেন।

প্রথম আলো:

আপনাদের ভোক্তা ঋণ ও ইসলামী ব্যাংকিং সেবা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মোহাম্মদ আলী: আমাদের ভোক্তা ঋণের বড় অংশ গাড়ির ঋণে, যেখানে আমাদের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে। সম্ভবত সব ব্যাংকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। এ ছাড়া আমরা কৃষি খাতে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। আবাসন খাতে আমাদের ৮০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা এটি তিন হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে চাই। এ ছাড়া বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমাদের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে সিলেটের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ফাইল আমাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় প্রতিটা সূচকে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

প্রথম আলো:

নতুন বছরে আপনাদের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মোহাম্মদ আলী: আমরা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করছি। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বজায় রাখা এবং গ্রাহকের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি স্থিতিশীল ও আধুনিক ব্যাংক হিসেবে পূবালী ব্যাংককে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। এ জন্য ক্যাশলেস বাংলাদেশ
গঠনে অবদান রাখা এবং ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে কাজ করছি আমরা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডেটা মাইনিং এবং ব্লকচেইন ব্যবহারের জন্য আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইতিমধ্যে চ্যাটবট চালুর অনুমোদন নিয়েছি এবং গ্রাহকসেবায় এআই-ভিত্তিক নতুন পণ্য আনার পরিকল্পনা করছি।