ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি

পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং আমাদের ব্যবসায়িক কৌশলের মূল স্তম্ভ

বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই র‍েটিং–২০২৪ এ রয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংক। টেকসই অর্থায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী রেজা ইফতেখার।

প্রথম আলো:

বাংলাদেশ ব্যাংকের করা টেকসই ব্যাংকের তালিকায় স্থান পেয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক। এই স্বীকৃতিকে কীভাবে দেখছেন?

আলী রেজা ইফতেখার: এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। আমরা এটিকে শুধু একটি অর্জন হিসেবে দেখছি না। বরং পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসনের প্রতি ইস্টার্ন ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি যে অঙ্গীকার তারই একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ এই স্বীকৃতি। এটি এমন এক স্বীকৃতি, যা আমাদের সব বিভাগ, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অংশীদারদের সম্মিলিত পরিশ্রম ও কৌশলগত পরিকল্পনার ফল। এই স্বীকৃতি আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে আরও অনুপ্রেরণা জোগাবে।

প্রথম আলো:

এই স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে আপনাদের কোন উদ্যোগ বা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে আপনি মনে করেন?

আলী রেজা ইফতেখার: আমার বিশ্বাস, এই অর্জনের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্তের কার্যকর ভূমিকা ছিল। প্রথমেই বলতে হয়, আমরা সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছি। গত বছর (২০২৪ সাল) আমাদের মেয়াদি ঋণের ৩৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বরাদ্দ করেছি, যা তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই প্রবৃদ্ধি শুধুই সংখ্যার বিষয় নয়, এটি আমাদের চিন্তার গভীরতা ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। এ ছাড়া আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের আওতায় ২০০ কোটি টাকার বেশি পুনঃ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পেরেছি।

”আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের আওতায় ২০০ কোটি টাকার বেশি পুনঃ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পেরেছি।
আলী রেজা ইফতেখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি
প্রথম আলো:

টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বা গ্রাহকদের কীভাবে অগ্রাধিকার দিয়েছেন?

আলী রেজা ইফতেখার: আমরা পরিবেশবান্ধব ও সমাজ-সহায়ক প্রকল্প এবং উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে সব সময়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্র—যেমন সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাসভিত্তিক উদ্যোগে আমরা নিয়মিতভাবে অর্থায়ন করেছি। এ ছাড়া বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি স্থাপনের মতো পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল কার্যক্রমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে আসছি। পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ বেড়েছে আমাদের। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব যানবাহন, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন পরিবহন অবকাঠামোতে বিনিয়োগে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দিয়ে অর্থায়ন করছি আমরা। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে আমরা বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তা অর্থায়নের কর্মসূচি পরিচালনা করছি, যাতে তাঁরা টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এ ছাড়া এসএমই গ্রাহকদের মধ্যে যারা পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক প্রভাব সৃষ্টিকারী ব্যবসায় যুক্ত, তাদের কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও পুনঃ অর্থায়নের সুবিধা প্রদান করছি।

প্রথম আলো:

পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন?

আলী রেজা ইফতেখার: ইস্টার্ন ব্যাংকের কাছে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং এখন শুধু একটি উদ্যোগ নয়, এটি আমাদের মূল ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম মূল স্তম্ভ। আমরা মনে করি, একটি আধুনিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা আর্থিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমান গুরুত্ব দেয়। আমাদের প্রধান কার্যালয়টি পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সোলার গ্লাস ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ১৬ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। ভবনের নকশায় প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি অফিসে মোশন সেন্সর লাইটিং, এনার্জি-স্মার্ট এসি সেটিংস এবং হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার আমাদের জ্বালানিসাশ্রয়ী মানসিকতার প্রতিফলন।

প্রথম আলো:

গ্রাহক বা ব্যবসায়িক অংশীদারদের টেকসই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে ব্যাংক কী ধরনের প্রণোদনা বা সুবিধা দিয়েছে?

আলী রেজা ইফতেখার: ইস্টার্ন ব্যাংক টেকসই উন্নয়নকে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করে। আমরা শুধু নিজেদের পথচলায় সন্তুষ্ট নই, বরং আমাদের গ্রাহক ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের এই যাত্রায় অংশীদার করতে সচেষ্ট। এ লক্ষ্যে আমরা শুধু আর্থিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকিনি, বরং টেকসই চিন্তাভাবনা ও চর্চার জন্য একটি সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি। পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন প্রকল্পে আমরা কম সুদে ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব ঋণসুবিধা প্রদান করছি। যেখানে ডিইজি, এফএমও, আইএফসি এবং এডিবির মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পাশে রয়েছে।